দেশে তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ২৫, ২০২৬, ১২:১৬ এএম

হঠাৎ করে দেখা দেয়া জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক সংকটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর জনজীবন। সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে শত শত মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকেই তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন, যার ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বাইকার ও রাইডশেয়ার চালকরা।

পাম্পে পাম্পে লম্বা সারি : গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মতিঝিল, রামপুরা, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের সামনে কয়েকশ মিটার দীর্ঘ লাইন। কোথাও গাড়ির সারি মূল সড়ক ছাড়িয়ে পাশের গলিতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ বা ‘সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। এতে চালকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। তীব্র রোদ উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পাওয়ার ঘটনা যেন নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, তবুও অনিশ্চয়তা : মতিঝিল এলাকার একটি পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী আল আমিন বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে লাইনে আছি। এখন জানানো হচ্ছে বিকেল ৩টার আগে তেলের গাড়ি আসবে না। অফিসে যেতে পারিনি, তেলও পেলাম না।’

এ ধরনের অভিজ্ঞতা শুধু একজনের নয়; প্রায় প্রতিটি পাম্পেই একই চিত্র। অনেকেই দিনের কাজ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাইডশেয়ার চালকরা : এই সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন রাইডশেয়ারিং সেবার সঙ্গে যুক্ত মোটরসাইকেল চালকরা। তাদের অনেকেরই আয়ের একমাত্র উৎস এই পেশা।

মালিবাগ মোড়ে একটি সার্ভিস স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সোহেল বলেন, ‘এই বাইক দিয়েই সংসার চলে। যদি সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি আর তেল না পাই, তাহলে আয় বন্ধ হয়ে যাবে। পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।’ অনেক চালককে তেল শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে পাম্পের আশপাশেই বসে থাকতে দেখা গেছে, শুধু ট্যাঙ্কার আসার আশায়।

সরবরাহ ব্যবস্থায় ধীরগতি : পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল সমস্যা হচ্ছে সরবরাহে বিলম্ব। ডিপো থেকে ট্যাঙ্কার যথাসময়ে না পৌঁছানোর কারণে পাম্পগুলোতে মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। রামপুরা এলাকার একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মী জানান, ‘সকাল থেকেই প্রচণ্ড চাপ। কিন্তু আমাদের ট্যাঙ্কে তেল নেই। ডিপো থেকে তেল না এলে আমরা দিতে পারব না। বিকেলের দিকে সরবরাহ এলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।’ তাদের মতে, হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কৃত্রিম সংকট নাকি বাস্তব সমস্যা : জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি পুরোপুরি সরবরাহ ঘাটতির কারণে তৈরি সংকট নয়; বরং আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদাও বড় ভূমিকা রাখছে। সামপ্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সম্ভাব্য সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে।

নগর জীবনে প্রভাব : এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে পুরো নগর জীবনে। ডেলিভারি সার্ভিস, কুরিয়ার, ছোট পরিবহন্তসব খাতেই কার্যক্রম ধীর হয়ে গেছে।

অনেক ডেলিভারি কর্মী সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে পারছেন না। এতে ই-কমার্স খাতেও প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে অফিসগামী মানুষও সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না।

যানজট ও বিশৃঙ্খলা : পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনের কারণে অনেক সড়কে যানজট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ত এলাকায় এই সমস্যা আরও প্রকট। যানবাহনের সারি সড়কের একাংশ দখল করে রাখায় অন্য গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। এতে নগরজুড়ে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

সরকারি অবস্থান : সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। তবে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সাময়িক ব্যবধান তৈরি হওয়ায় এই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

পাম্প মালিকদের আশাবাদ : পাম্প মালিকরা বলছেন, দিনের দ্বিতীয় ভাগে ট্যাঙ্কার পৌঁছালে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হতে পারে। তারা গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। একজন পাম্প মালিক বলেন, ‘আমরা নিজেরাও চাপে আছি। তেল না থাকলে আমরা বিক্রি করব কীভাবে? সরবরাহ এলেই দ্রুত বিতরণ শুরু করব।’

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও দ্রুত করতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। তাদের মতে, অপ্রয়োজনীয় মজুত বন্ধ করা গেলে এবং চাহিদা স্বাভাবিক রাখা গেলে এ ধরনের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সামনে কী হতে পারে : বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে তা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে পরিবহন ও সরবরাহ খাতে এর প্রভাব বাড়তে পারে। তবে দিনের শেষভাগে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় কিছুটা স্বস্তির আশা করছেন সবাই।

সব মিলিয়ে, রাজধানীতে হঠাৎ দেখা দেওয়া জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের ভোগান্তি তৈরি করেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পাওয়া, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং আয়ের ওপর প্রভাব- সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক কমানো- এই দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।