বাংলাদেশের অর্থনীতি সাম্প্রতিক দশকে ধারাবাহিক বৃদ্ধির পথচলা অব্যাহত রাখলেও বাণিজ্যের আড়ালে অবৈধ অর্থের প্রবাহ বা পাচার দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) সমপ্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে) এই পরিমাণ ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার অর্থ পাচার হচ্ছে।
জিএফআই-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে অন্যতম উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের অবৈধ অর্থের প্রবাহ কেবল সরকারের কর রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অর্থ পাচারের মূল পথ, বাণিজ্যের আড়াল : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অর্থ পাচারের প্রধান উপায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে। আমদানুিরপ্তানি সংক্রান্ত কাগজপত্রে ভিন্ন তথ্য প্রদান করে পণ্যমূল্য, পরিমাণ ও দামের কারসাজি করা হয়। এর ফলে বিদেশে আসল চেয়ে বেশি বা কম অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। নিরীক্ষক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কারসাজি শুধু ব্যক্তিগত লভ্যাংশের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখার জন্যও করা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে অর্থ পাচারের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশে অর্থ পাচারের সমস্যা নতুন নয়। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি জানিয়েছিল যে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এ সময়ের বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলার ১২০ টাকা) এর পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি। প্রতিবছর গড়ে এটি ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা হয়। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের স্বার্থপর ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তারা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা এই পরিমাণ অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করেছে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি খাতে এবং বৃহৎ ব্যবসায়িক চক্রের মাধ্যমে অর্থ পাচারের কৌশল বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে।
জিএফআই-এর সামপ্রতিক প্রতিবেদন- বাংলাদেশে ১০ বছরের তথ্য : জিএফআই-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে মোট পাচারকৃত অর্থ ৬,৮৩০ কোটি ডলার, বর্তমান বাজারদরে ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, প্রতিবছর গড়ে ৬৮৩ কোটি ডলার, মোট বাণিজ্যের শতকরা প্রায় ১৬%।
বড় অংশ পাচার হয় মিথ্যা বাণিজ্য ঘোষণার মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্যের এই কৌশল ‘লুকানো দুষ্প্রভাব’ হিসেবে কাজ করে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও কর রাজস্বকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। মোট পাচারকৃত অর্থের প্রায় ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার উন্নত অর্থনীতির দেশে গেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থ বাণিজ্যের আড়ালে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। এটি দেশের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য বড় হুমকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় অর্থনীতির দেশগুলোর বাণিজ্য বেশি হওয়ায় সেখানে অবৈধ অর্থের প্রবাহও বেশি। বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে বাণিজ্য কম হলেও পাচারের হার প্রবল।
অর্থ পাচারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব : অর্থ পাচার শুধুমাত্র প্রাইভেট লাভের বিষয় নয়। এটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কাঠামোতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন- অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের দুর্বলতা: সরকার যথাযথ কর আদায় করতে পারছে না। কর রাজস্ব হ্রাস: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যাহত: দেশি ও বৈদেশিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি। এ ধরনের কার্যক্রমে দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী চক্র সরাসরি লিপ্ত থাকে, যার ফলে সুশাসন ও প্রশাসনিক দক্ষতাও কমে যায়।
বাংলাদেশে অর্থ পাচারের প্রধান কৌশল : বাণিজ্যিক কারসাজি: আমদানি ও রপ্তানির বিবরণে মিথ্যা তথ্য। ভ্যারিয়েবল মূল্য প্রয়োগ: পণ্যের প্রকৃত মূল্য হ্রাস বা বৃদ্ধি করে অর্থ পাচার। বিনিয়োগ চ্যানেল ব্যবহার: লভ্যাংশ, জড়ুধষঃরবং, ফ্র্যাঞ্চাইজি ও তৃতীয় দেশ ট্রানজ্যাকশন। ব্যাংকিং লুপহোল: বৈদেশিক ব্যাংক ও অ-নিয়ন্ত্রিত ফাইন্যান্সিয়াল চ্যানেল ব্যবহার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা এবং নিয়ন্ত্রক ত্রুটিও পাচারের সুযোগ বাড়ায়।
পাচার ঠেকানোর সুপারিশ : জিএফআই’র প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জন্য কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছে- শুল্ক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা: আমদানি-রপ্তানির তথ্য যাচাই এবং স্বয়ংক্রিয় নজরদারি। আঞ্চলিক তথ্য বিনিময়: প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক তথ্য শেয়ারিং। স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে লেনদেন স্বচ্ছতা নিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আর্থিক ও বাণিজ্য নীতি সমন্বয়। প্রযুক্তি ব্যবহার: বড় ডেটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থ পাচার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশের পাশাপাশি এশিয়ার অন্যান্য দেশেও অর্থ পাচারের হার উদ্বেগজনক। চীনের এক দশকে ৬.৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার পাচারের তথ্য দেখায়, অর্থাৎ বার্ষিক বাণিজ্যের ২৫% অবৈধভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারত ও থাইল্যান্ডেও এই হার যথাক্রমে ২২% এবং ২০%। বাংলাদেশে বাণিজ্যের আড়ালে পাচারের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম, তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কর রাজস্বে ক্ষতি বড়।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থ পাচার সীমিত নয়, বরং তা দেশের উন্নয়ন, সামাজিক সেবা ও জনকল্যাণের জন্য একটি বড় হুমকি। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থ পাচার প্রতিদিনই সরকারকে কর রাজস্ব ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ থেকে বঞ্চিত করছে। এই সমস্যা সমাধান না হলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
সর্বোপরি, জিএফআই-এর প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, অবৈধ অর্থের এই প্রবাহ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির মূল কাঠামোকে দুর্বল করে, কর রাজস্ব কমিয়ে দেয় এবং উন্নয়নমূলক বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশকে এখন দরকার সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাণিজ্য-সম্পর্কিত অর্থ পাচার রোধের কার্যকর পরিকল্পনা।