বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এখন এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রাকৃতিক গ্যাসের সীমাবদ্ধতা, নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের এলপিজি আমদানির চিত্রে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে বাজারের নিয়ন্ত্রণ, উৎস দেশের প্রভাব এবং বৈশ্বিক রাজনীতির ছায়া।
সামপ্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশে বছরে যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়, তার প্রায় ৭৬ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র চারটি কোম্পানি। এর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ওমেরা পেট্রোলিয়াম, যা এককভাবে মোট আমদানির প্রায় ১৯ শতাংশ সরবরাহ করছে।
এলপিজি আমদানির আকার ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব : গত এক বছরে বাংলাদেশে মোট ১২৭ কোটি ৩৮ লাখ মার্কিন ডলারের এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৫ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকার সমান (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে)। এই বিপুল আমদানি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ব্যাংকিং খাতের এলসি (ঋণপত্র) খোলার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে এসেছে, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়কে অন্তর্ভুক্ত করে।
বাজারে কার দাপট কত : বাংলাদেশের এলপিজি বাজারে কয়েকটি বড় কোম্পানির প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। এর মধ্যে ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৯%, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি ১৭%, মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি ১৬%, যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার ১৬%। এই চারটি প্রতিষ্ঠানই মিলে বাজারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ওমেরা পেট্রোলিয়াম এক বছরে প্রায় ২৩ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের এলপিজি আমদানি করেছে, যা তাকে শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছে। পেট্রোম্যাক্স এলপিজি দ্বিতীয় স্থানে থেকে ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের এলপিজি আমদানি করেছে। মেঘনা গ্রুপের মেঘনা ফ্রেশ এবং যমুনা স্পেসটেকও প্রায় সমপরিমাণ আমদানি করেছে।
অন্যান্য কোম্পানির অবস্থান : বাজারে মাঝারি ও ছোট কোম্পানিগুলোর অংশ তুলনামূলক কম হলেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিএম এনার্জি (বিডি) ৮%, ইউনাইটেড আইগ্যাস ৭%, ডেল্টা এলপিজি ৪%, জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস ও প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস ৩%।
এছাড়া বসুন্ধরা এলপি গ্যাস, এসকেএস এলপিজি এবং টিএমএসএস এলপিজি প্রতিটি প্রায় ২ শতাংশ করে আমদানি করে। ছোট অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে পদ্মা এলপিজি, দুবাই বাংলা এলপি গ্যাস এবং এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন- যারা প্রত্যেকে প্রায় ১ শতাংশ করে আমদানি করে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রধান উৎস দেশ : বাংলাদেশে এলপিজির সবচেয়ে বড় উৎস এখন যুক্তরাষ্ট্র। মোট আমদানির প্রায় ২০ দশমিক ৯৩ শতাংশ এলপিজি আসে এই দেশ থেকে। এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ উৎস দেশগুলো হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৮.৯৬%), ওমান (১৬.২৭%), ইরাক (১২.১৩%), সৌদি আরব (৯.৩০%)। এই পাঁচটি দেশ মিলেই বাংলাদেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কুয়েতসহ আরও বিভিন্ন দেশ থেকেও এলপিজি আমদানি করা হয়।
রপ্তানিকারক বনাম উৎস দেশ : একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যেসব দেশ থেকে এলপিজি আমদানি করা হয়, সেগুলো সবসময় উৎপাদনকারী দেশ নয়। অনেক ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ভারতের মতো দেশগুলো বাণিজ্যিক হাব হিসেবে কাজ করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী- সিঙ্গাপুর ২৯.৫২%, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২৬.২৪%, ভারত ১১.৮৮%। এই তিন দেশ থেকেই প্রায় ৬৮ শতাংশ এলপিজি আমদানি করা হয় (এলসি খোলার ভিত্তিতে)।
সরবরাহ চেইন- কীভাবে আসে এলপিজি : বাংলাদেশে এলপিজি মূলত সমুদ্রপথে বড় জাহাজে করে আসে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জাহাজ ভিড়ার পর- ১. বড় জাহাজ থেকে ছোট লাইটার জাহাজে স্থানান্তর, ২. টার্মিনালে সংরক্ষণ, ৩. সিলিন্ডারে বোতলজাত, ৪. পরিবেশকদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ। এই পুরো প্রক্রিয়া একটি জটিল লজিস্টিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
যুদ্ধের প্রভাব ও বাজার অস্থিরতা : সামপ্রতিক ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের এলপিজি আমদানিতেও। ওমেরা পেট্রোলিয়ামের মালিকানা প্রতিষ্ঠান ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।
কেন বাড়ছে এলপিজির চাহিদা : বাংলাদেশে এলপিজির চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের সীমাবদ্ধতা, নতুন আবাসিক এলাকায় গ্যাস সংযোগের অভাব, শিল্প খাতে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি, গ্রামাঞ্চলে বিকল্প জ্বালানির প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এলপিজির ব্যবহার আরও বাড়বে।
বাজারে প্রতিযোগিতা ও চ্যালেঞ্জ : যদিও বড় চারটি কোম্পানি বাজারের বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে, তবে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলো বাজারে টিকে থাকতে উন্নত সাপ্লাই চেইন, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও নিরাপত্তা মান উন্নয়ন- এই বিষয়গুলোতে জোর দিচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিগত প্রশ্ন : বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এলপিজি সরবরাহ একটি কৌশলগত বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত্ত সবকিছুই সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা, স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা খোঁজা- এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশে এলপিজি বাজারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই খাত আরও সমপ্রসারিত হবে। তবে একই সঙ্গে প্রয়োজন সুশাসন, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা মান নিশ্চিতকরণ।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের এলপিজি বাজারে ওমেরা পেট্রোলিয়ামের নেতৃত্ব, চার কোম্পানির আধিপত্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উৎস হিসেবে আবির্ভাব সব মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র সামনে এসেছে। এই খাত শুধু জ্বালানির যোগানই দিচ্ছে না, বরং দেশের অর্থনীতি, শিল্প এবং দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বাজারের কেন্দ্রীকরণ এবং সরবরাহ ঝুঁকি এই তিনটি বিষয় ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।