যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে স্বস্তির আবহ তৈরি হলেও, তেহরানের নতুন শর্তে ফের ঘনীভূত হচ্ছে দুশ্চিন্তার মেঘ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার পরিবর্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইরান। রুশ সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, এখন থেকে এই রুট দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজকে যাতায়াতের অনুমতি দেবে তেহরান, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় নগণ্য।
‘স্বাভাবিক’ দিন এখন অতীত : ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি সূত্র তাস-কে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সূত্রটির মতে, এখন থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে হলে তাকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সরাসরি অনুমতি নিতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বর্তমান যুদ্ধবিরতির অধীনে প্রতিদিন ১৫টির বেশি জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিটি যাতায়াত একটি নির্দিষ্ট প্রোটোকল এবং আইআরজিসির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। আমরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি যে, যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার অবাধ যাতায়াত ব্যবস্থায় আর ফিরে যাওয়া হবে না।”
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন মাত্র ১৫টি জাহাজের এই সীমাবদ্ধতা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চেইনকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
আর্থিক শর্ত : কেবল সামরিক বা কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নয়, যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে বড় ধরনের আর্থিক শর্ত জুড়ে দিয়েছে তেহরান। ইরান দাবি করেছে, বিদেশে অবরুদ্ধ থাকা তাদের সমস্ত আর্থিক সম্পদ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মুক্ত করতে হবে।
তাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সম্পদ মুক্তিকে ইরান ‘নির্বাহী নিশ্চয়তা’ হিসেবে দেখছে; অর্থাৎ এটি না হলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়বে না।জাতিসংঘের প্রস্তাব ও যুদ্ধের সমাপ্তি : তেহরান আরও জানিয়েছে, তারা কেবল মুখে বা অস্থায়ী সমঝোতায় বিশ্বাসী নয়। ইরান চায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব শর্তে যুদ্ধের সমাপ্তিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
সূত্রটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে : “যদি আমাদের নির্ধারিত শর্তের ভিত্তিতে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে যুদ্ধের ইতি টানা না হয়, তবে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে পুনরায় লড়াই শুরু করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। গত ৪০ দিন আমরা যেভাবে লড়াই করেছি, প্রয়োজনে আবারও সেই পথে হাঁটব।”
ওয়াশিংটনের প্রতি কড়া বার্তা : যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইরানের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে এসেছে;
১. সামরিক উপস্থিতি: এই দুই সপ্তাহের বিরতিকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নতুন কোনো সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম বৃদ্ধি করতে পারবে না।
২. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: ইরান জানিয়েছে তারা বর্তমান চুক্তির লিখিত শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলছে, তবে ওয়াশিংটনকেও একইভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে।
কেন এই ১৫ জাহাজের কৌশল : বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন মাত্র ১৫টি জাহাজের কোটা নির্ধারণ করে ইরান আসলে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। এর মাধ্যমে তারা পশ্চিমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যেন তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবিগুলো দ্রুত মেনে নেওয়া হয়। মূলত হরমুজ প্রণালিকে ‘কৌশলগত হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে তেহরান আলোচনার টেবিলে নিজেদের পাল্লা ভারী করছে।
সর্বোপরি, ইরানের এই নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। আগামীকাল ইসলামাবাদে হতে যাওয়া বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দল ইরানের এই ‘১৫ জাহাজ’ নীতি ও সম্পদ মুক্তির দাবি কীভাবে মোকাবিলা করে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বশান্তি ও আগামীর জ্বালানি নিরাপত্তা।