গ্রামীণ ঐতিহ্যের নতুন শহুরে আভিজাত্য

বাকী বিল্লাহ প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ১২:৪৪ এএম

তপ্ত রোদ, ধুলোবালি আর বৈশাখী মেলার ভিড়ে এক সানকি পান্তা-ইলিশ যেন নাগরিক জীবনে বাঙালির শেকড় সন্ধানের এক বড় অনুষঙ্গ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাত পুরুষ কি এভাবেই পান্তা-ইলিশ খেয়ে নতুন বছর শুরু করত? ইতিহাস ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, এই প্রথার শিকড় যতটা না ইতিহাসে, তার চেয়ে বেশি রয়েছে গত কয়েক দশকের নাগরিক সাংস্কৃতিক বিবর্তনে।

শেকড়ের সন্ধানে, পান্তা থেকে ‘আমানি’ : বাঙালির পান্তা খাওয়ার ইতিহাস কয়েকশ বছরের পুরনো। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যেও পান্তার সরব উপস্থিতি দেখা যায়। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল কাব্যে কালকেতুর ভোজন পর্বে আমানির (পান্তা ভেজানো পানি) উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রামীণ জনপদে পান্তা ছিল মূলত কৃষকের শক্তি। সারাদিন মাঠে রোদে কাজ করার জন্য কার্বোহাইড্রেটের জোগান দিতে বাসি ভাতে পানি দিয়ে রাখা হতো। এটি কেবল খাবারের অপচয় রোধই করত না, বরং পান্তা ভাতের ল্যাকটিক অ্যাসিড গরমে শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করত। পয়লা বৈশাখের সকালে অনেক অঞ্চলে ‘আমানি’ খাওয়ার প্রচলন ছিল, যেখানে চাল ও আমের কচি ডাল ভিজিয়ে রাখা পানি ছিটিয়ে দেয়া হতো সারা ঘরে, যা মঙ্গল কামনার প্রতীক হিসেবে গণ্য হতো।

শহুরে বৈশাখে পান্তা-ইলিশের অভিষেক : শহরে পান্তা-ইলিশের এই রাজকীয় যাত্রা খুব বেশি প্রাচীন নয়। গবেষকদের মতে, আশির দশকের শুরুতে (১৯৮৩ সালের দিকে) ঢাকার রমনা বটমূলকে কেন্দ্র করে এই প্রথার সূত্রপাত। শুরুটা যেভাবে: কয়েকজন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী আড্ডার ছলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বৈশাখের সকালে তারা পান্তা আর ইলিশ ভাজা দিয়ে নাস্তা করবেন। বিবর্তন: ধীরে ধীরে এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছডিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। নব্বইয়ের দশকে এসে এটি একটি জাতীয় উদযাপনের রূপ নেয়। বাণিজ্যিক প্রভাব: কালের পরিক্রমায় এর সঙ্গে যুক্ত হয় চটুল বাণিজ্যিক অনুষঙ্গ। মাটির সানকিতে পান্তা খাওয়া তখন আর কেবল কৃষকের খাবার থাকে না, হয়ে ওঠে নাগরিক আভিজাত্যের প্রতীক।

সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট, গ্রাম বনাম শহর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও শিক্ষক রাশেদা রওনক খান মনে করেন, গ্রামীণ সংস্কৃতি যখন শহরে আসে, তখন তা প্রায়ই এলিট শ্রেণির মাপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। সাধারণ কৃষকের নুন-লঙ্কা আর পেঁয়াজ দিয়ে খাওয়া পান্তার সাথে যখন দামি ইলিশ মাছ যুক্ত হয়, তখন তা আর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাবার থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি ‘পারফরম্যান্স’। অনেকে মনে করেন, এই পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতির কারণে বছরের এই সময়ে ইলিশের দাম আকাশচুম্বী হয়, যা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য সামাজিক চাপ তৈরি করে। এমনকি জাটকা নিধন ও প্রজনন মৌসুমে ইলিশের সংকট নিয়েও সচেতন মহলে বারবার উদ্বেগ দেখা গেছে।

ঐতিহ্যের সরলতা কি হারাবে : পান্তা-ইলিশ যতটা না গভীর লোকজ ঐতিহ্যের অংশ, তার চেয়ে বেশি আধুনিক শহুরে সংস্কৃতির মোড়ক। তবে সমালোচকরা যাই বলুন না কেন, বৈশাখের তপ্ত দুপুরে এক থালা পান্তা এখনও বাঙালির প্রাণের আরাম। ইলিশ থাকুক বা না থাকুক, পান্তা ভাত তার নিজস্ব সরলতা নিয়ে বাঙালির পাতে টিকে থাকবে চিরকাল এমনটাই প্রত্যাশা সুস্থ ধারার সংস্কৃতিমনা মানুষের। সর্বোপরি, পান্তা ছিল কৃষকের জীবনধারণের রসদ, আর ইলিশ তার সাথে যুক্ত হয়ে হয়েছে নাগরিক উৎসবের প্রতীক। ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধন যেন কেবল প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ না থেকে বাঙালির শেকড়কে সম্মান জানাতে শেখায়।