গ্যাস খাতে অশনিসংকেত

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ০৯:২৮ এএম

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। বিগত আট বছরে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে এখন তলানিতে ঠেকেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে দৈনিক গড়ে ২৬৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো, বর্তমানে তা ১৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘ দুই দশকের স্থবিরতা এবং আবিষ্কৃত কূপগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সংযোগ দিতে না পারার ব্যর্থতা আজ পুরো অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই উৎপাদন ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকার ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এই আমদানিনির্ভর নীতিকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

একদিকে ডলার সংকট ও আকাশচুম্বী আমদানি ব্যয়, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের নিস্পৃহ অবস্থা- সব মিলিয়ে দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আবাসিক খাত আজ গভীর ‘অশনিসংকেত’ প্রত্যক্ষ করছে। সময়মতো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করতে না পারলে, এই জ্বালানি সংকট অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় গ্রিড ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।

উৎপাদন ও সরবরাহের বর্তমান চিত্র : জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট সরবরাহ প্রায় ২৫৩ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি ৮২ কোটি ঘনফুট এবং স্থানীয় উত্তোলন ১৭১ কোটি ঘনফুট। স্থানীয় উত্তোলনের সিংহভাগই আসছে বিদেশি দুই কোম্পানি শেভরন ও তাল্লোর হাত ধরে (প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট), যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি কোম্পানির অবদান মাত্র ৭৬ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও এই রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো দেশের শিল্পের চাকা সচল রাখতে বড় ভূমিকা পালন করত।

কেন কমছে উৎপাদন : বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত দুই দশক ধরে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে এক ধরনের ‘অচলাবস্থা’ বিরাজ করছে। ২৯টি আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে মাত্র ২০টি থেকে বর্তমানে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে ২০২৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৬১ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্যে ৫০টি কূপ খননেরপরিকল্পনা নেয়া হলেও তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ৩০টির বেশি কূপ খনন করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে গ্রিডে কাঙ্ক্ষিত গ্যাস যুক্ত করা যায়নি। বিশেষ করে ভোলায় আবিষ্কৃত বিপুল গ্যাস পাইপলাইন সংকটের কারণে মূল ভূখণ্ডে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এখন সেই গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তর করে আনার নতুন পরিকল্পনা করছে বর্তমান সরকার।

এলএনজি আমদানিতে বিপুল ব্যয় ও যুদ্ধকালীন সংকট : আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সাত বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে চলতি মাসে দ্বিগুণ দামে পাঁচটি এলএনজি কার্গো কিনতে হয়েছে বাংলাদেশকে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ বন্ধ থাকলে বা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ব্যয় আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ : সংকট মোকাবিলায় পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ নতুন কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে- ১৮০ দিনের পরিকল্পনা: জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট নতুন গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। ৫ বছরের মহাপরিকল্পনা: আগামী পাঁচ বছরে ১১৭টি কূপ খননের মাধ্যমে ১৫৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন রিগ ক্রয়: স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে পেট্রোবাংলা নতুন দুটি রিগ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। সমুদ্র জয়: সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে বড় ধরনের গতি আনার চেষ্টা চলছে, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো বিদেশি কোম্পানির চূড়ান্ত আগ্রহ দেখা যায়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিমত : জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেয়ার নীতি টেকসই নয়। স্থানীয় অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গত ২০ বছরের যে স্থবিরতা, তা কাটাতে না পারলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। সাগরে অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় মডেল পিএসসি (উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি) এবং স্বচ্ছ নীতিমালার বিকল্প নেই।

সর্বোপরি, গ্যাস খাতের এই বর্তমান স্থবিরতা কেবল একটি সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। আমদানিনির্ভর নীতি সাময়িকভাবে চাহিদা মেটালেও ডলার সংকট এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তা দেশের অর্থনীতিকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিগত দুই দশকের উদাসীনতা আজ শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমদানির বিকল্প খুঁজতে হবে দেশের অভ্যন্তরেই।

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা, ভোলার গ্যাসকে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরনো কূপগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ঘাটতি দেশের শিল্প উৎপাদনকে পঙ্গু করে দিতে পারে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হবে সাধারণ জনগণকে। তাই একটি টেকসই ও স্বনির্ভর জ্বালানি নীতি প্রণয়ন ও তার দ্রুত বাস্তবায়নই হতে পারে এই অশনিসংকেত থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।