সবকিছুই আছে- বিশাল রানওয়ে, সুউচ্চ টার্মিনাল, দক্ষ জনবল আর আধুনিক সব অবকাঠামো। নেই কেবল রানওয়ে স্পর্শ করা কোনো যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। তিন দশক ধরে বন্ধ থাকা কুমিল্লা বিমানবন্দরটি আজ এক বিচিত্র ও বিস্ময়কর অর্থনৈতিক রূপকথার নাম। কোনো ফ্লাইট ওঠানামা ছাড়াই আকাশপথের সেবা দিয়ে প্রতি বছর এই বিমানবন্দর আয় করছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
বন্ধ থেকেও যেভাবে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা : কুমিল্লা বিমানবন্দরের রানওয়েতে এখন ঘাস জন্মালেও এর আকাশপথ ব্যস্ত থাকে ২৪ ঘণ্টা। বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন আহাম্মদ জানিয়েছেন, এখানে থাকা অত্যাধুনিক ডিভিওআর, ডিএমই এবং ভিস্যাট প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী উড়োজাহাজকে নিরবচ্ছিন্ন দিকনির্দেশনা দেয়া হয়।
আয়ের মূল উৎস : প্রতিদিন ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের ২৫ থেকে ৩০টি আন্তর্জাতিক বিমান কুমিল্লার আকাশপথ ব্যবহার করে। এই ‘নেভিগেশন’ বা দিকনির্দেশনা সেবার বিনিময়ে ওইসব দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় মাশুল আদায় করা হয়। ফ্লাইট ছাড়া এই নিভৃত আয় থেকে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাচ্ছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট- যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নীরবতা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৪১-৪২) ব্রিটিশ ও মার্কিন বাহিনী কৌশলগত কারণে এই বিমানবন্দরটি তৈরি করেছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এখানে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলেছে। তবে লোকসানের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ফের চালু হলেও মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় যাত্রী সংকটের অজুহাতে আবারও নীরব হয়ে যায় এই রানওয়ে। বর্তমানে ৭৭ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বিমানবন্দরটি যেন এক ঘুমন্ত দানব।
ইপিজেড ও রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত : কুমিল্লা বিমানবন্দরের ঠিক পাশেই অবস্থিত দেশের অন্যতম সফল রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড)। এখানে ৪৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। ২০২৪ সালের রপ্তানি আয়: ৯০২ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের (চলতি সময় পর্যন্ত) আয়: ৬১৯ মিলিয়ন ডলার।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বিমানবন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরাসরি কুমিল্লায় আসতে পারবেন। এতে কার্গো পরিবহনের সুবিধা বাড়বে, যা রপ্তানি বাণিজ্যের গতি ও মুনাফা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
প্রবাসীদের দীর্ঘশ্বাস ও দুর্ভোগ : প্রবাসী আয়ের বা রেমিট্যান্সের দিক থেকে কুমিল্লা জেলা শীর্ষে। পরিসংখ্যান বলছে— ২০২৩ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫২০ জন বিদেশ গিয়েছেন। ২০২৪ সালে ৯২ হাজার ৯১১ জন। ২০২৫ সালে ৭৬ হাজার ৪৫৮ জন।
প্রতি বছর হাজার হাজার প্রবাসী কুমিল্লার সন্তান হলেও তাদের ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে গিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে উঠতে হয়। যাতায়াতের ভোগান্তি ও যানজটের কারণে প্রবাসীদের সময় ও অর্থ- উভয়ই অপচয় হচ্ছে। কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হলে এই প্রবাসীরা সরাসরি নিজ জেলা থেকেই যাতায়াত করতে পারতেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যে বিমানবন্দর বন্ধ থেকেও আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করে কোটি টাকা আয় করতে পারে, সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে তা হবে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক হাব। এটি কেবল যাতায়াত নয়, বরং পর্যটন ও কার্গো পরিবহনের এক স্বর্ণদুয়ার হিসেবে কাজ করবে।
সবশেষে বলা যায়, কুমিল্লার মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন সম্ভাবনার এই রানওয়ে আর কত দিন নীরব থাকবে? সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল কি পারবে এই ‘কোটি টাকা আয়ের যন্ত্র’টিকে একটি সচল ও প্রাণবন্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করতে? কুমিল্লার সমৃদ্ধ অর্থনীতির চাকা এখন এই উত্তরের অপেক্ষাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে।