ঢাকার নগর পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে মেট্রোরেল প্রকল্পকে। যানজট নিরসন, সময় সাশ্রয় এবং আধুনিক গণপরিবহন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তবে উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি প্রকল্পের আকাশচুম্বী ব্যয় নিয়ে অর্থনৈতিক মহল ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা ও বিতর্কও ক্রমেই বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়, তবে ব্যয়ের স্বচ্ছতা, পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেলের প্রতিটি ধাপেই প্রযুক্তি, নির্মাণসামগ্রী ও বৈদেশিক নির্ভরতার কারণে ব্যয়ের চাপ বাড়ছে, যা সামগ্রিক বাজেটে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সরকারপক্ষ বলছে, রাজধানীর যানজটের কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সময় অপচয় হচ্ছে, তার তুলনায় এই বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হবে। দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং নগরজীবনে স্বস্তি ফিরবে। সব মিলিয়ে, মেট্রোরেল এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং উন্নয়ন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। তবে নতুন এই প্রকল্পগুলোর প্রাক্কলিত ব্যয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় জনমনে এবং বিশেষজ্ঞ মহলে দেখা দিয়েছে তীব্র উদ্বেগ।
নতুন রুট ও প্রকল্পের বর্তমান চিত্র : বর্তমানে এমআরটি লাইন-৬ চালু থাকলেও কাজ শুরু হয়েছে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ লাইনের- এমআরটি লাইন-১: এটি দেশের প্রথম পাতাল (আন্ডারগ্রাউন্ড) রেল হতে যাচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের কাজ চলমান। এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন রুট): হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনের কাজও প্রক্রিয়াধীন। এর বড় একটি অংশ মাটির নিচ দিয়ে যাবে। এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট): গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত এই লাইনের পরিকল্পনাও প্রায় চূড়ান্ত।
ব্যয়ের মাত্রা অত্যধিক : ঢাকার নতুন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উঠছে তা হলো- প্রতি কিলোমিটারে খরচের মাত্রা। এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয়: এই প্রকল্পে কিলোমিটার প্রতি গড় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। তুলনামূলক চিত্র: ভারতের দিল্লি বা কলকাতায় পাতাল রেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা। এমনকি উন্নত দেশগুলোর আধুনিক মেট্রোরেল নির্মাণের গড় ব্যয়ের তুলনায়ও ঢাকার প্রাক্কলিত ব্যয় ২ থেকে ৩ গুণ বেশি। কেন এত বেশি খরচ, কর্তৃপক্ষের যুক্তি : ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা খরচের পেছনে বেশ কিছু যুক্ত তুলে ধরছেন— ১. জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ: ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জমি অধিগ্রহণের মূল্য অত্যধিক। এছাড়া ইউটিলিটি লাইন (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির পাইপ) স্থানান্তর করতে বড় অংকের টাকা ব্যয় হয়। ২. প্রযুক্তি ও ঋণের শর্ত: বাংলাদেশের মেট্রোরেল মূলত বিদেশি ঋণে (যেমন জাইকা বা এডিবি) নির্মিত। ঋণের শর্ত অনুযায়ী উন্নত মানের জাপানি বা ইউরোপীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ৩. মাটির গুণাগুণ: ঢাকার নরম মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে রেললাইন নির্মাণ করা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ৪. বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি: ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং নির্মাণ সামগ্রীর (রড, সিমেন্ট, পাথর) আন্তর্জাতিক বাজার দর বাড়ায় প্রাথমিক বাজেটের তুলনায় চূড়ান্ত বাজেট অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
অর্থনীতিবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেগা প্রকল্পের উচ্চ ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা হিসেবে চাপে। তাদের মতে- ঋণের বোঝা: প্রকল্প বাস্তবায়নে যে বিশাল বৈদেশিক ঋণ নেয়া হচ্ছে, তার কিস্তি পরিশোধের চাপ ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করতে পারে। আয় বনাম ব্যয়: মেট্রোরেলের টিকিট বিক্রি করে এই নির্মাণ ব্যয় তুলে আনা প্রায় অসম্ভব। ফলে স্থায়ীভাবে সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে এটি চালাতে হবে। স্বচ্ছতার অভাব: প্রকল্পের দরপত্র এবং পরামর্শক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব থাকে বলে অনেক সময় কৃত্রিমভাবে ব্যয় বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রশ্ন : উন্নয়ন বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, একই প্রযুক্তিতে অন্য দেশ যা পারছে, বাংলাদেশ কেন তার কয়েকগুণ বেশি খরচ করছে? তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বাজেটে বাড়তি চাপ যোগ করে। এমআরটি লাইন-৬ এর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, কয়েক বছর দেরি হওয়ায় ব্যয় মূল বাজেটের চেয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা বেড়ে গিয়েছিল। নতুন লাইনগুলোর ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে মেট্রোরেল প্রকল্প ঢাকার নগর উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যানজট নিরসন, দ্রুত ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা ইতোমধ্যে নগরবাসীর মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। যাতায়াতে সময় সাশ্রয় এবং নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থার কারণে এটি রাজধানীর জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রাখে। তবে এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় ও আর্থিক চাপ নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বড় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে মেট্রোরেলের নির্মাণ ও পরিচালনা ব্যয় রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন।
এ অবস্থায় প্রয়োজন হলো ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি বজায় রাখা। একই সঙ্গে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি, যাতে উন্নয়ন ও ব্যয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমীকরণ তৈরি হয়। ফলে বলা যায়, মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শন, আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।