বিদ্যুৎ ও জ্বালানির তীব্র সংকটে বাংলাদেশের টেলিকম খাত এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। মোবাইল অপারেটরদের প্রধান তথ্যভাণ্ডার ও নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র বা ‘ডাটা সেন্টার’গুলো সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে কোম্পানিগুলো। অপারেটরদের সংগঠন এমটব সতর্ক করে দিয়েছে যে, অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপ না থাকলে যে কোনো মুহূর্তে দেশব্যাপী মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
‘মস্তিষ্ক’ অচল হওয়ার উপক্রম : দেশের মোবাইল অপারেটরদের মোট ২৭টি ডাটা সেন্টার রয়েছে, যেখান থেকে কোটি কোটি গ্রাহকের কল, এসএমএস এবং ইন্টারনেট ট্রাফিক রাউটিং করা হয়। এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার এই ডাটা সেন্টারগুলোকে মোবাইল অপারেটরের ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় গ্রিড বিদ্যুৎ না থাকায় এই সেন্টারগুলো এখন জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় এগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ডাটা সেন্টার বন্ধ হওয়া মানে সমগ্র নেটওয়ার্ক মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
ডিজেলের হাহাকার- প্রতিদিনের বিশাল চাহিদা : টেলিকম টাওয়ার এবং ডাটা সেন্টার সচল রাখতে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন, তা সরবরাহ করা স্থানীয় পাম্পগুলোর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ডাটা সেন্টারের চাহিদা: একটি মাঝারি মানের ডাটা সেন্টার চালাতে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০-৬০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ৪ হাজার লিটার। গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক এই তিন অপারেটর কেবল ডাটা সেন্টার চালাতেই প্রতিদিন ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল ব্যবহার করছে। টাওয়ারের চাহিদা: দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার টাওয়ার সচল রাখতে তিন অপারেটরের দৈনিক ডিজেল লাগছে ৫২ হাজার ৪২৪ লিটার এবং ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন।
বিটিআরসিকে জরুরি চিঠি ও এমটবের আরজি : পরিস্থিতি বেগতিক দেখে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে জরুরি চিঠি দিয়েছে এমটব। চিঠিতে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এখন অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে যে বিপর্যয় নেমে আসবে- আর্থিক লেনদেন: মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) ও অনলাইন ব্যাংকিং অচল হয়ে পড়বে। জরুরি সেবা: ৯৯৯-এর মতো জরুরি সেবা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। প্রশাসন: ডিজিটাল গভর্নেন্স এবং সরকারি দাপ্তরিক কাজ স্থবির হয়ে যাবে।
বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জ্বালানি পরিবহন : অপারেটররা অভিযোগ করেছেন, এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটরের জন্য জ্বালানি নিয়ে যাওয়ার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর জ্বালানি মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, ‘বিটিএস সাইট এবং ডাটা সেন্টারগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জ্বালানি পরিবহন নির্বিঘ্ন করা এখন সময়ের দাবি।’
সংকট উত্তরণে এমটবের ৪ দফা দাবি : জাতীয় বিপর্যয় এড়াতে এমটব সরকারের কাছে চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে- সমন্বয় সভা: বিদ্যুৎ, জ্বালানি বিভাগ, বিপিসি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ: ২৭টি প্রধান ডাটা সেন্টার ও ট্রান্সমিশন হাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা। সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ: প্রয়োজনে ডিপো থেকে সরাসরি জ্বালানি সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া। নিরাপত্তা নিশ্চিত: জ্বালানি পরিবহনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিশ্চিত করা।
সর্বোপরি, স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন যখন বাস্তবায়নের পথে, তখন জ্বালানি সংকটে টেলিকম নেটওয়ার্কের এই নাজুক অবস্থা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেলিকম সেবা সচল রাখা কেবল যোগাযোগের বিষয় নয়, এটি এখন দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। সরকার যদি দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নেয়, তবে দেশ এক ভয়াবহ ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটে’র কবলে পড়বে, যার মাশুল দিতে হবে প্রতিটি নাগরিককে।