২০২৩ সালের শেষভাগে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ‘কালাজ্বর নির্মূল’-এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম দেশ হিসেবে এই মরণব্যাধি বিদায়ের গৌরব অর্জন করেছিল বাংলাদেশ।
তবে অর্জনের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় সেই সাফল্যের মুকুটে এখন অনিশ্চয়তার ছায়া। মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে ক্রমবর্ধমান স্থবিরতা, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের তীব্র সংকট এবং নজরদারি ব্যবস্থার শিথিলতায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নতুন করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সামপ্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশের ২৬টি জেলার ১৬০টিরও বেশি উপজেলা এখনও কালাজ্বর সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে ‘রিল্যাপ্স’ বা পুনরায় আক্রান্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ওষুধের অভাবে তাদের সঠিক চিকিৎসা ব্যাহত হওয়া এই উদ্বেগকে আরও ঘনীভূত করছে। ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ বা বেলেমাছি নিধন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় সংক্রমণের উৎসগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে।
এক সময়ের প্রাণঘাতী এই রোগের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াই শেষে যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল, যথাযথ তদারকি ও প্রকল্পের ধারাবাহিকতার অভাবে তা আজ হুমকির মুখে। যদি এখনই ওষুধের মজুত নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ে নিবিড় স্ক্রিনিং শুরু না হয়, তবে নিয়ন্ত্রণে থাকা কালাজ্বর আবারও মহামারি আকারে ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের এই বড় অর্জন ধরে রাখা এখন নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।
সাফল্যের খতিয়ান ও বর্তমান ঝুঁকি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৯৭ সালে দেশে কালাজ্বর রোগীর সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৮৪৬ জন, যা ২০০৬ সালে বেড়ে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৩৭৯ জনে দাঁড়ায়। সরকারের জাতীয় কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচি, আধুনিক ‘অ্যাম্বিসোম’ চিকিৎসা এবং নিবিড় নজরদারির ফলে ২০২১ সালে রোগী সংখ্যা মাত্র ৯৯ জনে নেমে আসে।
তবে আশঙ্কার কথা হলো, এই সাফল্যের ‘আত্মতুষ্টি’ই এখন নতুন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের ২৬ জেলার ১৬৭টি উপজেলা এখনও কালাজ্বরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এই সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ভেঙে পড়ছে কর্মসূচির মূল কাঠামো : বাংলাদেশে ১৯৯৮ সাল থেকে সেক্টর প্রোগ্রাম হিসেবে রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। চতুর্থ এইচপিএনএসপি ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার পর পঞ্চম পর্যায় শুরু হতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। অপারেশন প্ল্যান বন্ধ: গত বছরের মার্চে হঠাৎ অপারেশন প্ল্যান বন্ধ করে দেওয়ায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও ওষুধ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ডিপিপি সংকট: প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম সংখ্যক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল অনুমোদিত হয়েছে, যা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
হাসপাতালে বাড়ছে রোগী ও রিল্যাপ্স কেস : রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, রোগীর সংখ্যা গত দুই বছরে ধীরে ধীরে বাড়ছে ২০২৪ সালে ১৮ জন শনাক্ত। ২০২৫ সালে ২১ জন শনাক্ত। ২০২৬ সালে (২১ এপ্রিল পর্যন্ত) ৮ জন শনাক্ত।
উদ্বেগের বিষয় হলো, শনাক্ত রোগীদের ২০ শতাংশই ‘রিল্যাপ্স’ বা পুরনো সংক্রমণ ফিরে আসা রোগী। ময়মনসিংহ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, পাবনা ও খুলনার পাশাপাশি নরসিংদীতেও নতুন রোগী মিলছে।
তীব্র ওষুধ সংকট, চিকিৎসা যখন অনিশ্চিত : কালাজ্বর চিকিৎসার সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ অ্যাম্বিজোম-এর মজুত এখন তলানিতে। কেন্দ্রীয় মজুতে বর্তমানে সর্বোচ্চ চারজন রিল্যাপ্স রোগীর চিকিৎসার ওষুধ রয়েছে, যেখানে প্রয়োজন প্রায় ৩০০০ ডোজ। রিল্যাপ্স রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হলে তারা নতুন সংক্রমণের দীর্ঘস্থায়ী উৎসে পরিণত হতে পারেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ‘টাইম বোমা’র মতো।
মাঠপর্যায়ে স্থবিরতা, ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ নেই : কালাজ্বরের বাহক বেলেমাছি নিয়ন্ত্রণে ইনডোর রেসিডুয়াল স্প্রে কার্যক্রম একসময় অত্যন্ত কার্যকর ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, একজন রোগী শনাক্ত হলে তার আশপাশের ৬০টি বাড়িতে টানা তিন বছর স্প্রে করার কথা। কিন্তু ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে কীটনাশকের অভাবে এই কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বেলেমাছির ঘনত্ব বাড়ছে এবং নতুন করে সংক্রমণের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।
জনবল সংকট ও নীরব হুমকি, পিকেডিএল : প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট প্রকট হয়েছে। আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্ক্রিনিং করা হলেও এখন তা স্থবির। অন্যদিকে পিকেডিএল বা চর্মরোগী এখন বড় হুমকি। এদের শরীরে দৃশ্যমান জটিলতা না থাকায় তারা চিকিৎসকের কাছে যান না, কিন্তু তাদের শরীরেই জীবাণু থেকে যায় যা সুস্থ মানুষের দেহে ছড়াতে পারে।
এখনই সতর্ক হওয়ার সময় : বিশেষজ্ঞদের মতে, কালাজ্বর নির্মূল হওয়া মানে এটি চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য সহনীয় মাত্রায় আসা। অতীতে ডিডিটি স্প্রে বন্ধ হওয়ার পর রোগটি যেমন ফিরে এসেছিল, বর্তমান অবহেলা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘শূন্য সংক্রমণ’-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সর্বোপরি, কালাজ্বর নির্মূলের গৌরব ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নজরদারি জোরদার, রিল্যাপ্স রোগীদের জন্য জরুরি ওষুধ সংগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ে বেলেমাছি নিধন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে না পারলে বাংলাদেশের এই বিশাল অর্জন ধুলোয় মিশে যেতে পারে। জনস্বাস্থ্যের এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
হামে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ শিশুর মৃত্যু: দেশে হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা আবারও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামে মোট ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯০ জনে, যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ওই সময়ের মধ্যে দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তিন হাজার ৮০৫ জন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৩৫ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হামের কারণে এখন পর্যন্ত ১৭ হাজার ৮৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১৪ হাজার ১০৬ জন। তবে নতুন করে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় টিকাদান কাভারেজ কম। তারা অভিভাবকদের শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে।