বিদ্যুৎ সংকটে দুর্ভোগ চরমে

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ১২:৩০ এএম

টানা কয়েকদিনের তীব্র দাবদাহ আর অসহ্য গরমে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিং। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম- সর্বত্রই এখন বিদ্যুতের হাহাকার। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সংকট, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের ঘাটতি; এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফ্যানের পাখার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত চোখ এখন আবারও সেই পুরনো তালপাতার পাখায় আশ্রয় খুঁজছে। কিন্তু আধুনিক নগরায়ণ আর পরিবেশের রুক্ষতায় সেই বাতাসও যেন এখন দুষ্প্রাপ্য।

খরতাপে কাবু জনজীবন, গ্রাম ও শহরের চিত্র : দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। বিশেষ করে রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা ও যশোর অঞ্চলে তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এই প্রচণ্ড গরমে একটু শীতল পরশের আশায় যখন মানুষ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল, ঠিক তখনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে জনপদ। গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও ভয়াবহ। সেচ মৌসুমে কৃষি জমিতে পানি দিতে পারছেন না কৃষকরা। লোডশেডিংয়ের কারণে গভীর নলকূপগুলো অচল হয়ে পড়ে থাকছে, ফলে রোদে পুড়ে নষ্ট হচ্ছে সোনালি ফসল। বাজারের লন্ডির দোকান থেকে শুরু করে ছোট-বড় শিল্প কারখানা- সবখানেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পড়তে বসতে পারছে না, হাসপাতালের রোগীদের কষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের ভাষায়, গরমের চোটে প্রাণ ওষ্ঠাগত, তার ওপর কারেন্ট নাই- এ যেন জ্যান্ত মরণ।

জ্বালানি সংকট ও বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাব : বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানিকৃত তেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, তাই ডলার সংকট ও সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ খাতে পড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রতা সাধনের কথা বলা হলেও চাহিদার বিশাল ঘাটতি লোডশেডিংকে অনিবার্য করে তুলছে।

জনগণের সচেতনতা- অপচয় রোধই কি একমাত্র পথ : বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। এখানে জনগণের সচেতনতা একটি বিশাল ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা যদি দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুতের সামান্যতম অপচয় রোধ করতে পারি, অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বাসাবাড়িতে সচেতনতা: দিনের বেলা জানালার পর্দা সরিয়ে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনে এসি ও ফ্যান চালু না রাখা এবং ঘরের অপ্রয়োজনীয় বাতি বন্ধ রাখা হতে পারে প্রাথমিক পদক্ষেপ। অফিস ও শিল্পকারখানা: অফিস ছুটির পর কম্পিউটার, এসি ও লাইট সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা নিশ্চিত করতে হবে। লন্ডির দোকান বা ছোট কারখানাগুলোতে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা) বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত রাখা জরুরি। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন: বিদ্যুতের সিস্টেম লস এবং অবৈধ হুক লাইন বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম কারণ। জনগণের সচেতন অবস্থানই পারে এই চুরি রোধ করতে। ‘একটি ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা মানে একটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা।’ এই মন্ত্রে যদি দেশের প্রতিটি নাগরিক উজ্জীবিত হয়, তবে লোডশেডিংয়ের চাপ বণ্টন অনেকটা সহজ হবে।

বিদ্যুতের হাহাকার থেকে বাঁচার উপায় কী : বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের দাবি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি—

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর: জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের মতো টেকসই উৎসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সেচ পাম্পগুলো সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনলে মূল গ্রিডের ওপর চাপ কমবে।

স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিকায়ন: পুরনো সঞ্চালন লাইনের কারণে অনেক বিদ্যুৎ অপচয় হয়। গ্রিড আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই সিস্টেম লস কমিয়ে আনা সম্ভব।

সুষম বণ্টন: বর্তমানে দেখা যাচ্ছে শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং অনেক বেশি। এই বৈষম্য দূর করে সুষম বিদ্যুৎ বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে যাতে কৃষি ও উৎপাদন খাত স্থবির হয়ে না পড়ে।

সরকারের কঠোর উদ্যোগ: জ্বালানি আমদানিতে অগ্রাধিকার দেয়া এবং বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি রোধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। তেল ও গ্যাস উত্তোলনে নিজস্ব খনিগুলোর উন্নয়নে গতি আনা এখন সময়ের দাবি।

মানুষের দাবি- লোডশেডিংমুক্ত বাংলাদেশ : তীব্র গরমে ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষ এখন আর অজুহাত শুনতে চায় না। তারা চায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এই সংকট সমাধানে যুদ্ধকালীন তৎপরতা দেখাতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা তেলের সংকটকে অজুহাত হিসেবে না দেখিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ। তপ্ত রোদে যখন তালপাতার বাতাসও গরম হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা বিদ্যুৎ। সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনা আর জনগণের সচেতন প্রয়াস- এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই কেবল সম্ভব লোডশেডিংমুক্ত একটি শীতল বাংলাদেশ। জনগণ আশা করছে, সরকার দ্রুতই এমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেবে যাতে দেশের মানুষ একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারে এবং উন্নয়নের চাকা সচল থাকে।

পরিশেষে, বিদ্যুৎ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এর অপচয় মানেই দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা। আসুন, আমরা নিজে সচেতন হই এবং অন্যকেও সচেতন করি। ছোট ছোট সাশ্রয়ই একদিন বড় সংকট থেকে আমাদের মুক্তি দেবে। লোডশেডিং থেকে বাঁচতে চায় দেশের মানুষ, আর সেই পথ তৈরিতে সরকার ও জনগণকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।