ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে। ২৫ কর্মদিবসের দীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল এই অধিবেশন সমাপ্ত হলেও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশান্তি ফেরেনি; বরং এক মৌলিক এবং ঐতিহাসিক প্রশ্নে এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে সরকার ও বিরোধী পক্ষ।
প্রশ্নটি হলো দেশের সর্বোচ্চ আইন ‘সংবিধান’ কি কেবল সময়োপযোগী কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘সংশোধন’ করা হবে, নাকি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে একে আমূল ‘সংস্কার’ বা পুনর্লিখন করা হবে। এই দুই মেরুর তর্কে এখন উত্তপ্ত সংসদ ভবন থেকে শুরু করে রাজপথের প্রতিটি মোড়। একদিকে সরকার আলোচনার মাধ্যমে একটি মধ্যপন্থা খোঁজার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো এবং রাজপথের নতুন শক্তিগুলো তাদের দাবি আদায়ে কঠোর বার্তা দিচ্ছে।
এক অনন্য সংসদের যাত্রা : সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনটি দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। দীর্ঘ দেড় যুগ পর এক নতুন ধারার সংসদ দেখল দেশবাসী। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং চিফ হুইপসহ ২২০ জন সদস্যই এবার প্রথমবারের মতো সংসদে পা রেখেছেন। তরুণ প্রজন্মের এই বিপুল উপস্থিতি সংসদীয় বিতর্কে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে।
অধিবেশনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো- বিরল ঐক্য: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য দেখা গেছে। কঠোর পরিশ্রম: অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ছুটির দিনেও সংসদ চলেছে। দীর্ঘ আলোচনা: রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনা করেছেন সংসদ সদস্যরা।
বিতর্কের মূলে সংস্কার বনাম সংশোধন : সংসদের ভেতরে কর্মচাঞ্চল্য থাকলেও মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘সংবিধান’। সরকার সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। তবে এই কমিটিতে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান : জামায়াত নেতা ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ সরাসরি জানিয়েছেন, তারা কেবল গুটিকয়েক সংশোধনীর পক্ষে নন। তার মতে, ‘সংশোধনী তো যে কোনো সময় করা যায়। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে একটি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের জন্য।’ জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়ার বিষয়ে তাদের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
রাজপথের শক্তির চাপ : জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে ১১-দলীয় ঐক্যজোটের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। তাদের মতে, বর্তমান সংবিধানের কাঠামোতে থেকে প্রকৃত গণতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব নয়।
সরকারের প্রত্যাশা ও সমঝোতার আহ্বান : এতকিছুর পরও সরকার আশাবাদী যে, শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলগুলো বিশেষ কমিটিতে অংশ নেবে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘গণতন্ত্র রক্ষায় তারা সরকারি দলকে ইতিবাচক সহযোগিতা করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।’ অন্যদিকে, বিএনপি এবার বেশ কৌশলী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান পরিবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করব তারা (বিরোধী দলগুলো) তাদের নামগুলো দেবে এবং একটা ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করার চেষ্টা করা হবে।’ প্রবীণ আইনজীবী ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনও জোর দিয়েছেন আলোচনার ওপর। তার মতে, রাজপথে বিশৃঙ্খলা করে নয়, বরং আলোচনার টেবিলেই সংবিধানের সমাধান খুঁজতে হবে।
আগামী ১ জুন রাজনীতির নতুন মোড় : আগামী ১ জুন সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই এক মাসের বিরতি হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়েই নির্ধারিত হবে- ১. বিরোধী দলগুলো কি সরকারের সংস্কার কমিটিতে যোগ দেবে ২. ‘জুলাই সনদ’ বা অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সংবিধানে কতটা প্রতিফলিত হবে ৩. রাজপথের আন্দোলন কি সংসদের আলোচনায় স্তিমিত হবে নাকি আরও চাঙ্গা হবে?
সর্বোপরি, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে রয়েছে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার তাগিদ, অন্যদিকে রয়েছে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর এক নতুন রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংবিধান উপহার দেয়াই এখন ত্রয়োদশ সংসদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ১ জুনের আগেই হয়তো পর্দার আড়ালে বড় কোনো সমঝোতা হতে পারে। তবে সমাধান যে পথেই আসুক, দেশবাসী চায় এমন একটি সংবিধান যা ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করবে না।