সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটুখানি ‘ভাইরালিটি’ আর সস্তা ‘ভিউ’ পাওয়ার নেশায় দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। তথাকথিত ‘বাস লাভার’ বা ‘স্পিড লাভার’ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের প্ররোচনায় এক শ্রেণির চালক মেতে উঠেছেন ভয়ংকর মরণখেলায়। চলন্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ছেড়ে হাততালি দেয়া, তীব্র গতিতে বিপজ্জনক ‘বাউলি’ কাটা কিংবা অন্য যানবাহনকে জীবনঝুঁকিতে ফেলে ওভারটেক করার দৃশ্য এখন সয়লাব ফেসবুক ও ইউটিউবের পাতায়।
ক্যামেরার সামনে বীরত্ব দেখাতে গিয়ে এই চালকরা কেবল নিজেদের জীবনই নয়, বরং বাসে থাকা সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের জীবনকেও ঠেলে দিচ্ছেন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে। সড়ক নিরাপত্তায় এই নতুন ডিজিটাল আপদ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, ভিউ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা কেবল আইনত দণ্ডনীয় অপরাধই নয়, এটি অন্য চালকদেরও বেপরোয়া হতে উৎসাহিত করছে।
এর ফলে একদিকে যেমন সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর চরম লঙ্ঘন হচ্ছে, অন্যদিকে ত্বরান্বিত হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এই উন্মাদনা রুখতে বিতর্কিত সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও চালকদের লাইসেন্স বাতিলের কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। ডিজিটাল খ্যাতির এই মরণনেশা এখনই বন্ধ করা না গেলে, সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বিআরটিএর উদ্বেগ ও আইনি কঠোরতা : বিআরটিএর সামপ্রতিক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ফেসবুক ও ইউটিউবের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিংয়ের ভিডিও ধারণ ও প্রচারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সংস্থাটি বলছে, এসব ভিডিও দেখে অন্য চালকরাও বিশেষ করে তরুণরা, একই ধরনের বিপজ্জনক আচরণে প্ররোচিত হচ্ছে।
বিআরটিএর চিহ্নিত অপরাধসমূহ- বেপরোয়া গতি: নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি গতিতেগাড়ি চালিয়ে ভিডিও করা। ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং: রাস্তার সরু জায়গায় বা বাঁকের মুখে অন্য যানবাহনকে বিপদে ফেলে ওভারটেক করা। বাউলি কাটা: চলন্ত রাস্তায় সাপের মতো এঁকেবেঁকে গাড়ি চালানো। অন্য যানবাহনে চাপ সৃষ্টি: বড় বাস দিয়ে ছোট গাড়ি বা মোটরসাইকেলকে রাস্তার কিনারায় ঠেলে দেয়া। দায়িত্বজ্ঞানহীন অঙ্গভঙ্গি: স্টিয়ারিং ছেড়ে হাততালি দেয়া বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ভিডিও ধারণ। সংস্থাটি মনে করিয়ে দিয়েছে যে, এই প্রতিটি কাজ ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী কঠোর দণ্ডনীয় অপরাধ।
সোশ্যাল মিডিয়া পেজ ও প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : বিআরটিএ কেবল চালকদের নয়, বরং যারা এসব ভিডিও প্রচার করে অনলাইন থেকে আয় করার চেষ্টা করছে, তাদেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা বা প্রচারে উৎসাহিত করলে সংশ্লিষ্ট পেজ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তায় এসব পেজ শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
মালিক সংগঠন ও কোম্পানির ওপর দায়বদ্ধতা : সড়কে এই বিশৃঙ্খলা রোধে কেবল সরকারি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বিআরটিএ সড়ক পরিবহন মালিক সংগঠন ও পরিবহন কোম্পানিগুলোকে তাদের অধীনে থাকা চালকদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। চালকরা যখন রাস্তায় থাকে, তখন তারা কী ধরনের আচরণ করছে বা কোনো ‘ইউটিউবার’কে গাড়িতে তুলে নিয়ে ভিডিও করাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কোম্পানিগুলোকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত : নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চালকের সহকারী বা বাসের ছাদে থাকা কিশোর-তরুণরা ভিডিও করার জন্য চালককে উত্তেজিত করে। চালকও বাহবা পাওয়ার আশায় আরও জোরে গাড়ি চালায়। এর ফলে মুহূর্তের অসাবধানতায় ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
প্রযুক্তিগত সমাধান- আসছে ‘আরএসপিএস’ অ্যাপ : সড়ক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটার বিধান কার্যকর করতে খুব শিগগিরই চালু হচ্ছে ‘আরএসপিএস’ অ্যাপ। এর মাধ্যমে কোনো চালক যদি বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের মাধ্যমে পয়েন্ট হারায়, তবে তার লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
বিআরটিএর ৫ দফা সুপারিশ ও আহ্বান— ১. ভিডিও ধারণ নিষিদ্ধ: চলন্ত বাসের ভেতর বা ড্রাইভিং সিটের পাশে দাঁড়িয়ে ভিডিও করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ২. চালক প্রশিক্ষণ: চালকদের সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব এবং সড়ক আইন সম্পর্কে সচেতন করা। ৩. অনলাইন মনিটরিং: বিপজ্জনক ভিডিও প্রচারকারী ফেসবুক গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে সম্মিলিত অভিযোগ জানানো। ৪. যাত্রীদের ভূমিকা: কোনো চালক ভিডিওর নেশায় বেপরোয়া গাড়ি চালালে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করা এবং হেল্পলাইন ১৬১০৭-এ জানানো। ৫. লাইসেন্স বাতিল: যারা বারবার আইন ভাঙছে, তাদের পেশাদার লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা।
পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা যেখানে মানুষের জীবনকে সহজ করার কথা, সেখানে ‘ভিউ’ আর ‘লাইক’-এর এই সস্তা জনপ্রিয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘাতক। সড়কের বেপরোয়া গতি কিংবা বিপজ্জনক স্টান্ট কোনো বীরত্ব নয়, বরং এটি একটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। বিআরটিএর কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও ডিজিটাল মনিটরিং প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলেও কেবল আইন দিয়ে এই মরণনেশা নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন চালক, পরিবহন মালিক এবং সাধারণ যাত্রীদের সম্মিলিত সচেতনতা।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের বুঝতে হবে যে, একটি ভাইরাল ভিডিওর চেয়ে একটি জীবনের মূল্য অনেক বেশি। ডিজিটাল খ্যাতির মোহে মত্ত হয়ে আমরা যেন সড়কের শৃঙ্খলা আর মানবিকতাকে বিসর্জন না দিই। আধুনিক নিরাপদ সড়ক বিনির্মাণে এই ‘ডিজিটাল বিশৃঙ্খলা’র অবসান ঘটিয়ে সুস্থ ও দায়িত্বশীল নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ভিউয়ের লোভে এই মরণখেলা দেশের সড়কগুলোকে স্থায়ী এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করবে।