রাজধানী ঢাকা আজ এক অদৃশ্য মরুভূমির ওপর দাঁড়িয়ে। মাটির ওপরে জনসমুদ্র আর মাটির নিচে ক্রমেই বেড়ে চলা বিশাল এক শূন্যতা। নগরের কয়েক কোটি মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে প্রতিদিন হাজার হাজার গভীর নলকূপ দিয়ে পাতাল চিরে তুলে আনা হচ্ছে কোটি কোটি লিটার পানি।
কিন্তু যে হারে এই মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করা হচ্ছে, পানিহারে তার পুনর্ভরণ বা রিচার্জ হচ্ছে না। ফলে প্রতি বছর ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এক সময়ের সহজলভ্য পানি এখন হাজার ফুট গভীরতার নিচে গিয়েও মিলছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর কংক্রিটের চাদরে ঢাকা পড়ার ফলে বৃষ্টির পানি এখন আর মাটির গভীরে পৌঁছাতে পারছে না। অন্যদিকে, চারপাশের নদীগুলোর দূষণ আমাদের বাধ্য করছে মাটির নিচের সঞ্চিত আধারের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল হতে। এই মাত্রাতিরিক্ত চাপের ফলে কেবল পানিসংকটই বাড়ছে না, বরং বাড়ছে ভূমি ধসের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক ঝুঁকির আশঙ্কা।
বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সরবরাহ সংকট নয়, বরং পরিবেশগত এক মহাবিপর্যয়ের পূর্বাভাস। এখনই যদি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে বিকল্প ও টেকসই উৎসের সন্ধান করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে তিলোত্তমা এই রাজধানী বসবাসের অযোগ্য এক তৃষ্ণার্ত প্রান্তরে পরিণত হবে। আগামীর প্রজন্মের জন্য এক ফোঁটা নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাতাল চিড়ে পানি উত্তোলন, এক অসম যুদ্ধ : ঢাকার দৈনিক পানির চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৩১৫ কোটি লিটার। এর বিপরীতে ওয়াসা সরবরাহ করতে পারছে ২৯৮ কোটি লিটার। এই বিশাল সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশই আসছে মাটির তলার এক হাজারের বেশি গভীর নলকূপ থেকে।
মাটিরওপরের উৎস- যেমন নদী বা বৃষ্টির পানি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়লেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সময় ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যেত মাত্র ২০-৩০ ফুট নিচে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা ৪০০ থেকে ৭০০ ফুট নিচে নেমে গেছে। অনেক এলাকায় পানি পেতে হলে এখন হাজার ফুটেরও বেশি গভীর পাইপ বসাতে হচ্ছে। এতে কেবল যন্ত্রপাতির খরচই বাড়ছে না, বরং বাড়ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ, যা পরোক্ষভাবে পানির দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এই হাহাকার; কারণ ও প্রতিক্রিয়া : ভূগর্ভস্থ পানির এই অস্বাভাবিক পতনের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণকে দায়ী করছেন গবেষকরা- ১. অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও কংক্রিটের জঙ্গল: ঢাকার খোলা মাটি এখন প্রায় বিলীন। রাস্তাঘাট ও বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে মাটির ওপর কংক্রিটের যে আস্তরণ পড়েছে, তা বৃষ্টির পানিকে মাটির গভীরে যেতে বাধা দিচ্ছে। ফলে ‘ওয়াটার টেবিল’ বা পানির স্তর প্রাকৃতিক উপায়ে পূর্ণ হতে পারছে না।
২. নদী দূষণ ও বিকল্প উৎসের অভাব: চারপাশ দিয়ে নদী থাকলেও বুড়িগঙ্গা, তুরাগ বা শীতলক্ষ্যার পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পদ্মা ও মেঘনা থেকে পানি আনার বড় বড় প্রকল্প (সায়দাবাদ, গন্ধর্বপুর) চলমান থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। ৩. জনসংখ্যা বিস্ফোরণ: ঢাকার জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে পানির চাহিদাও জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে গভীর নলকূপের ওপর চাপ কমানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞ মহলের উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা : বিখ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত মনে করেন, যে পরিমাণ পানি তোলা নিরাপদ, ঢাকা এখন তার সীমা বহু আগেই অতিক্রম করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এখনই বিকল্প উৎসে যেতে না পারি এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ না কমাই, তবে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা শহর ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, জলাধার ধ্বংস, পুকুর ভরাট এবং খাল দখলের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আর স্বাভাবিক হতে পারছে না। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের ফেলো মোহাম্মদ আমিনুর রসুল বাবুল বলেন, নগর পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
এক নজরে পরিসংখ্যান- দৈনিক পানির চাহিদা ৩১৫ কোটি লিটার, মোট সরবরাহ ২৯৮ কোটি লিটার। ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে প্রাপ্তি ৭০% (প্রায়), স্তর পতনের হার ২-৩ মিটার (প্রতি বছর)।
সমাধানে কী করা জরুরি : সংকট উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন- নদী শোধন: ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর পানিকে দূষণমুক্ত করে ব্যবহারযোগ্য করা।
রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং: ভবনের ছাদে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা। সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট: পদ্মা ও মেঘনা থেকে পানি আনার প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি। জলাধার সংরক্ষণ: নগরের অবশিষ্ট পুকুর ও জলাভূমি রক্ষা করা যাতে পানি রিচার্জ হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের এই ক্রমাগত পতন কেবল একটি পরিবেশগত সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্বের সংকটের পূর্বাভাস। গভীর নলকূপের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা রাজধানী ঢাকাকে এক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকৃতির দান এই পানির আধার অসীম নয়, আর তাই মাটির নিচের স্তরকে রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
শুধু গভীর থেকে পানি তুলে সাময়িক চাহিদা মেটানোর আত্মঘাতী পথ পরিহার করে আমাদের টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণ রোধ করে সেগুলোকে ব্যবহারযোগ্য করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তি প্রতিটি ভবনে বাধ্যতামূলক করা এবং নগরের অবশিষ্ট জলাশয়গুলো উদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি।
সরকারের গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে আগামী দিনে ঢাকার জন্য এক গ্লাস নিরাপদ পানি পাওয়াই হবে সবচেয়ে বড় বিলাসিতা। আমাদের আজকের উদাসীনতা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক পানিশূন্য ধূসর মহানগর রেখে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এখনই সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পানির অপর নাম জীবন আর সেই জীবনের আধার রক্ষায় কালক্ষেপণের আর কোনো সুযোগ নেই।