রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় কর্মজীবী নারীদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা এখন কেবল যাতায়াতের সংকট নয়, বরং তা এক তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও অসম্মানের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। কর্মজীবী নারীদের জন্য বাস এখনো প্রধান বাহন হলেও, প্রতিটি যাত্রাপথ তাদের জন্য যৌন হয়রানি, চরম অব্যবস্থাপনা এবং প্রচণ্ড মানসিক চাপের এক তিক্ত অভিজ্ঞতা বয়ে আনে।
সাম্প্রতিক সময়ে এক গবেষণা এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, নারীরা বাসে ওঠানামা থেকে শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ‘বাস রুট র্যাশনালাইজেশন’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত সম্প্রতি এক জরিপ থেকে জানা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ নারী নিয়মিত বাস ব্যবহার করেন।
এই জরিপে অংশগ্রহণকারী ৯৪২ জন কর্মজীবী নারীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বাসের ভিড়ে নারীরা প্রায়ই ইচ্ছাকৃত শারীরিক ও যৌন হয়রানির শিকার হন। প্রতিবাদ করলে অনেক সময় তাদের উল্টো হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। মেট্রোরেল চালু হওয়ার পরও নারীদের প্রধান বাহন বাসই রয়ে গেছে, কারণ এটি সাশ্রয়ী এবং শহরের অধিকাংশ রুটে বিস্তৃত। ঢাকার রাস্তায় বাসচালক ও হেলপারদের একাংশ নারী যাত্রীদের ‘অতিরিক্ত ঝামেলা’ হিসেবে বিবেচনা করেন।
অনেক ক্ষেত্রেই চলন্ত বাসে উঠতে বাধ্য করা হয় নারী যাত্রীদের, কারণ অনেক বাস নির্ধারিত স্টপেজে থামতে চায় না। মিরপুরের এক ব্যাংকার তানিয়া আক্তার জানান, চলন্ত অবস্থায় বাসে উঠতে গিয়ে শাড়ি পরা নারীরা দুর্ঘটনার ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাসের চালক ও হেলপাররা নারী যাত্রী দেখলে বাস থামাতেই অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, নারী যাত্রী তুললে সময় বেশি লাগে এবং সংরক্ষিত আসনের কারণে অন্য পুরুষ যাত্রী তোলার সুযোগ কমে যায়। এ কারণে অনেক নারী দীর্ঘ সময় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থেকেও বাস পান না। বাসে সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেখানে পুরুষ যাত্রীরা বসে থাকেন।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন যে, সংরক্ষিত আসনের কথা বললে অনেক সময় পুরুষ যাত্রী তো দূরের কথা, হেলপাররাও সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন না। এছাড়া বাসের উঁচু চেসিস, ভাঙা সিঁড়ি এবং রেলিংয়ের অভাব গর্ভবতী নারী, শিশুসহ মা এবং বয়স্ক নারীদের জন্য বাসে ওঠানামাকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
বাসস্টপগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। ২০০টি বাসস্টপের প্রায় সবগুলোই অনিরাপদ এবং পর্যাপ্ত আলোর অভাব রয়েছে। হকারদের দখলে থাকা এই জায়গাগুলোয় নারীরা ছিনতাই ও উত্ত্যক্ত হওয়ার ভয়ে থাকেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার সময় পাবলিক টয়লেট না থাকা নারী যাত্রীদের জন্য আরেকটি বড় সংকট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবহন সংকট সরাসরি নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। বুয়েট অধ্যাপক ড. আসিফ-উজ-জামান খান বলেন, ‘নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন না থাকলে নারীরা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বেন। এটি কেবল যাতায়াতের সমস্যা নয়, বরং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বড় বাধা।’
মেট্রোরেল চালুর ফলে কর্মজীবী নারীদের যাতায়াতের পরিধি বেড়েছে এবং তাদের চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিটিসিএ-এর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম। তবে বাসভিত্তিক গণপরিবহনকে নারীবান্ধব করতে না পারলে এই সীমাবদ্ধতা কাটানো কঠিন।
নারীবান্ধব পরিবহন নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলেছেন- আচরণগত পরিবর্তন: পরিবহন শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। প্রযুক্তি ও মনিটরিং: বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং যাত্রী আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। অবকাঠামোগত উন্নয়ন: বাসস্টপে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পাবলিক টয়লেট নির্মাণ।
বিশেষ সেবা: প্রয়োজনে ‘দোলনচাঁপা’ বা বিশেষ নারী বাসসেবা পুনরায় চালু করা। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম স্বীকার করেছেন যে, গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি এবং এটি সামগ্রিক সামাজিক সংকট।
সর্বোপরি, ঢাকার গণপরিবহনে নারীদের প্রতিদিনের এই সংগ্রাম কেবল একটি পরিবহনগত সমস্যা নয়, এটি একটি কাঠামোগত ও সামাজিক সংকট। যখন নারীরা কেবল অফিসে পৌঁছানোর লড়াইয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন তাদের কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীলতা হ্রাস পাওয়া স্বাভাবিক। রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত সমন্বিত পরিকল্পনা, কঠোর নীতিমালা এবং নারীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে না পারে, তবে কর্মক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হতেই থাকবে। নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন নারীদের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।