বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। গত কয়েক দশকে সস্তা শ্রমশক্তির ওপর ভর করে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এবং প্রবাসী আয়ের ধারা এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের ফলে প্রথাগত কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে আসছে, যার বিপরীতে তৈরি হচ্ছে দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তির বিশাল চাহিদা।
একদিকে বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে শিক্ষা ও দক্ষতার সমন্বয়ের অভাবে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের রপ্তানি বাজার ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
অভিবাসী কর্মীদের জন্য উন্নত ও নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেয়ার মতো চ্যালেঞ্জগুলো এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করা কঠিন হবে। শ্রমবাজারের এই নতুন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজন এখনই সঠিক নীতি নির্ধারণ এবং তা কার্যকর করার দূরদর্শী উদ্যোগ।
এদিকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রায় ৮২ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল রেমিট্যান্স জোগানদাতা। তবে সামপ্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত কয়েক মাসে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র ইস্যুর হার আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা ১ কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় এই লক্ষ্য অর্জন এখন বড় প্রশ্নের মুখে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এবিষয়ে জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে, যা আমাদের পরিকল্পনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে আমরা হাত গুটিয়ে বসে নেই।’
সরকার এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। মালয়েশিয়া শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে এবং থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মতো নতুন দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শ্রম প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, কেবল অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে এখন আর কাঙ্ক্ষিত আয় সম্ভব নয়। তাই সরকার বর্তমানে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আধুনিকায়ন: দেশে বর্তমানে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) রয়েছে, যা আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানোর কাজ চলছে। নতুন কেন্দ্র: আরও ৫০টি নতুন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। ভাষা শিক্ষা: জাপান ও কোরিয়ার মতো বাজারে কর্মী পাঠাতে ভাষাশিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে।
ইউরোপগামী অবৈধ অভিবাসন রোধে এবং দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরকার জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। এছাড়া প্রবাসীদের সেবায় ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ চালু এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণ সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অভিবাসন আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতারণাকারী এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স স্থগিত করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট কেবল একটি সাময়িক বিপর্যয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক নির্ভরশীলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে না পারলে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার যদি দ্রুত নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা এবং দক্ষ প্রশিক্ষণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবেই এই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।