সিসার বিষে বিপন্ন শৈশব

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

দেশের সড়কগুলোতে দিন দিন বাড়ছে ইজিরাইডার ও ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট। তবে গণপরিবহন খাতের এই যান্ত্রিক রূপান্তরের উল্টো পিঠে জমা হচ্ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের এক ভয়ংকর বিপর্যয়।

কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, লোকালয় ও ফসলি জমির পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ কারখানাগুলোতে চলছে ই-রিকশার ব্যবহূত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের মহোৎসব। এই অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত সীসার গুঁড়ো ও পারদ বাতাসে মিশে তৈরি করছে এক নীরব মহামারি, যার প্রধান শিকার হচ্ছে দেশের কোমলমতি শিশুরা।

চিকিৎসক ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, সীসা হলো এমন এক চতুর ও নীরব ঘাতক যা সরাসরি শিশুদের রক্তে মিশে তাদের বুদ্ধিমত্তা আজীবনের জন্য কমিয়ে দেয়। এর বিষাক্ত প্রভাবে শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র বিকল হওয়া, মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া, কিডনি নষ্ট হওয়া এবং রক্তস্বল্পতাসহ স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এই বিষাক্ত বাণিজ্য কেবল পরিবেশ আইনের চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং দেশের পুরো একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশবিদরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, এখনই যদি এই অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া না হয়, তবে সীসা দূষণের এই নিঃশব্দ আগ্রাসন বাংলাদেশের কোটি শিশুর শৈশবকে চিরতরে পঙ্গু করে দেবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিরাইডার চলাচল করছে। প্রতিটি রিকশাকে সচল রাখতে গড়ে চারটি করে সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। এই বিপুল সংখ্যক যানের কারণে ব্যাটারি বর্জ্যের এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, যার কোনো সঠিক ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা দেশে নেই।

সংক্ষিপ্ত আয়ুষ্কাল: এসব সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারিরকার্যক্ষমতা বা আয়ুষ্কাল সাধারণত মাত্র ৯ মাস থেকে ১ বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এগুলো অকেজো বর্জ্যে পরিণত হয়। বছরে ২ কোটি বর্জ্য: প্রতি বছর দেশে প্রায় ২ কোটি ব্যবহূত পুরাতন ব্যাটারি জমা হচ্ছে। অবৈধ প্রক্রিয়াজাতকরণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্য ব্যাটারির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই পরিবেশ অধিদপ্তর বা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও উন্মুক্ত কারখানায় রিসাইক্লিং করা হয়।

দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়, বিশেষ করে মহাসড়কের পাশে, লোকালয়ের ভেতরে বা ফসলি জমির মাঝে ব্যাটারি গলানোর শত শত অবৈধ কারখানা বা চুল্লি গড়ে উঠেছে। কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই এসব কারখানায় অত্যন্ত আদিম ও বিপজ্জনক পদ্ধতিতে কাজ করা হয়।

১. উন্মুক্ত পরিবেশে ব্যাটারি ভাঙা: প্রথমে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ব্যাটারির প্লাস্টিকের বডি ভাঙা হয়। এর ভেতরের বিষাক্ত ও অত্যন্ত ক্ষতিকারক অ্যাসিড সরাসরি মাটিতে বা ড্রেনে ঢেলে দেয়া হয়, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দূষিত করছে।

২. সিসা গলানো: ব্যাটারির ভেতরে থাকা সিসার প্লেটগুলো খোলামেলা বিশাল কড়াই বা চুল্লিতে গলানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় সিসার ঘন কালো ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।

৩. মাটি ও খাদ্যে বিষাক্ততা: বাতাসের সিসা কণা আশেপাশের ফসলি জমিতে ও ঘাসের ওপর আস্তরণ তৈরি করে।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, ‘সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের নামে যত্রতত্র কারখানা গড়ে ওঠায় মাটি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। সেই দূষিত মাটিতে উৎপাদিত খাদ্যশস্য, শাকসবজি এবং তা খেয়ে বেঁচে থাকা গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির মাধ্যমে এই বিষ সরাসরি মানুষের প্লেটে চলে আসছে।’ সিসা দূষণের সবচেয়ে প্রথম এবং প্রধান শিকার হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং গ্লোবাল হেলথ অর্গানাইজেশনগুলোর সামপ্রতিক গবেষণায় সিসা দূষণের এক ভয়াবহ রূপ সামনে এসেছে।

শোষণের উচ্চ হার: পিওর আর্থের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাস জানান, শিশুরা বড়দের তুলনায় চার থেকে পাঁচগুণ বেশি সিসা শরীর ও রক্তে শোষণ করে। ফলে তাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত: রক্তে সিসার উপস্থিতি শিশুদের শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মেধা বিকাশ অবরুদ্ধ করে এবং আইকিউ মারাত্মকভাবে হ্রাস করে। শিশুদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা ও অতিরিক্ত আগ্রাসী মনোভাব তৈরির পেছনেও সিসার হাত রয়েছে। খেলনা ও খাদ্যশৃঙ্খল: শুধু ব্যাটারি নয়, রিকশার ব্যাটারি গলানো সিসা দিয়ে তৈরি সস্তা খেলনা, নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র এবং মসলার রঙের মাধ্যমেও শিশুদের রক্তে বিষাক্ত সিসা মিশছে।

আইসিডিডিআর,বি-র জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. মাহাবুবুর রহমান পরিস্থিতির গভীরতা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সিসা পরিবেশের প্রায় সব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি মানুষ, প্রাণী ও কৃষিপণ্যকে গ্রাস করছে। এর কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। তাই দূষণের মূল উৎস অর্থাৎ অবৈধ উপায়ে ব্যাটারি গলানো পুরোপুরি বন্ধ করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।’

শুধু শিশু নয়, সিসা দূষণ গর্ভবতী নারীদের জন্য এক নীরব অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গর্ভবতী নারীর রক্তে সিসার মাত্রা বেশি থাকলে তা প্ল্যাসেন্টা বা গর্ভফুলের মাধ্যমে সরাসরি গর্ভস্থ ভ্রূণের শরীরে প্রবেশ করে। এর ফলে অনাগত সন্তানের মস্তিষ্কের গঠন শুরুতেই নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়াও এর কারণে গর্ভপাত, অকালে মৃত সন্তান প্রসব বা কম ওজনের প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

লোকালয়ে অবৈধভাবে ব্যাটারি গলানোর এই মহোৎসব বন্ধে নড়েচড়ে বসছে প্রশাসন। পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘যারা নিয়ম বহির্ভূতভাবে যত্রতত্র ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা উৎপাদন করছে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা ও কারখানা সিলগালা করা হবে। এই নীরব সংকট রুখতে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করে মাঠে নামছে, যাতে বিষাক্ত সিসার উৎসগুলো চিরতরে বন্ধ করা যায়।’

ব্যাটারিচালিত রিকশা দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও যাতায়াতের সস্তা মাধ্যম, তাই একে একবারে বন্ধ করা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। তবে এর ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

১. লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে রূপান্তর: প্রচলিত ক্ষতিকারক সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে রিকশাগুলোতে পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে বাধ্য করা বা সরকারি প্রণোদনা দেয়া। ২. স্বীকৃত গ্রিন রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট: যত্রতত্র ব্যাটারি ভাঙা নিষিদ্ধ করে কেবল মাত্র পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রপ্রাপ্ত, আধুনিক ফিল্টার ও ইটিপি যুক্ত সেন্ট্রাল রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে ব্যাটারি প্রক্রিয়াজাতকরণের নিয়ম করা। ৩. নজরদারি ও কঠোর জরিমানা: স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে অবৈধ চুল্লিগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া এবং দণ্ডবিধি অনুযায়ী কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।

রিকশার ব্যাটারি থেকে নির্গত সিসা হয়তো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর বিষাক্ততা দেশের কোটি শিশুর মেধা ও সম্ভাবনাকে প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে। একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে যতই এগিয়ে যাক না কেন, তার আগামী প্রজন্ম যদি মেধাহীন ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হিসেবে গড়ে ওঠে, তবে সেই উন্নয়নের কোনো মূল্য থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে তা যেন কেবল কাগজে-কলমে বা সাময়িক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থাকে। ব্যাটারিচালিত যানবাহনের এই নীরব ও বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সংকট রুখতে সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা এবং তার কঠোর প্রয়োগই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিষাক্ত সিসার হাত থেকে রক্ষা করতে।