ভোর হতেই ড্রাম ঘুরিয়ে ভ্যান নিয়ে হাজির হন ভাগাড়ের কর্মীরা। শান্তিনগরের মতো ঢাকার ব্যস্ত এলাকাগুলোতে হাজার হাজার কর্মীর এই নিরলস পরিশ্রমেই পরিচ্ছন্ন থাকে ঢাকা মহানগরী। কিন্তু তাদের এই ঘাম ঝরানো কাজের আড়ালে যে এক বিশাল ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’ বর্জ্যকে ঘিরে কোটি টাকার বাণিজ্য গড়ে তুলেছে, তা সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত। সেবার আড়ালে এই বাণিজ্যের বলি হচ্ছে সাধারণ নাগরিক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ২২টি থানার ৭৫টি ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা ফি নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফ্ল্যাটপ্রতি ১২০ থেকে ২০০ টাকা, ছোট দোকান থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং রেস্টুরেন্ট থেকে দুই হাজার টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্র পাওয়ার জন্য সিটি কর্পোরেশনে ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা পর্যন্ত অফেরতযোগ্য জামানত প্রদান করে। এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ তুলে নিতেই মূলত ‘অঘোষিত সিন্ডিকেট’ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। এখানে অভিযোগ রয়েছে, কোনো বৈধ টেন্ডার বা আইনি অনুমোদন ছাড়াই প্রভাবশালী একটি চক্র এলাকাভিত্তিক বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। রসিদ দিয়ে টাকা তোলা হলেও নিয়মিত সেবা প্রদানের বালাই নেই। অতিরিক্ত চাঁদা না দিলে এলাকায় ভ্যান ঢোকে না, ফলে দিনের পর দিন ময়লা জমে থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বর্জ্য সংগ্রহের এই অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম স্পষ্টভাবে জানান, নির্ধারিত ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘যদি এমন অনিয়ম সত্যিই ঘটে থাকে, তবে পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হবে।’
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন জানিয়েছেন, বর্তমানে উত্তর সিটিতে বর্জ্য সংগ্রহ নিয়ে এমন কোনো টেন্ডার কার্যক্রম নেই, যা থেকে বোঝা যায় পুরো খাতটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচ্ছন্নতার আড়ালে এই বাণিজ্য কেবল সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে না, বরং রাষ্ট্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো একটি অপরিহার্য সেবাকে যখন গুটিকয়েক প্রভাবশালী চক্র কুক্ষিগত করে ফেলে, তখন সেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এটি একদিকে যেমন নাগরিক অধিকার ক্ষুক্ষ করছে, তেমনি শহরের সামগ্রিক পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এখন অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছে একটি অদৃশ্য শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে। কাওসারের মতো কর্মীরা যারা ভোরবেলা থেকে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন, তাদের পরিশ্রমের সুফল যেন সরাসরি নগরবাসী পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল নামমাত্র তদারকি নয়, সিটি কর্পোরেশনগুলোকে এই খাতটিকে পুরোপুরি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমেই এই কোটি টাকার বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব। নগরবাসীর প্রত্যাশা, বর্জ্য অপসারণ হোক একটি সেবামূলক কাজ, কোনো অশুভ সিন্ডিকেটের আয়ের উৎস নয়।