কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, রামু এবং মাতামুহুরী অববাহিকার জনপদগুলো এখন এক বিশাল জলমগ্ন কারাগারে পরিণত হয়েছে। গত এক সপ্তাহের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপকূলীয় এই জেলার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হিসেবে জেলায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি। বসতঘর ডুবে যাওয়ায় হাজার হাজার পরিবার তাদের গৃহস্থালি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। গত চার দিন ধরে অনেক পরিবারে রান্নার চুলা জ্বলেনি, ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের শাকের মোহাম্মদচর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোছাইন। তার বসতঘর এখন পানির নিচে। গত চার দিন ধরে তার ঘরে আগুন জ্বলেনি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তার। হোছাইন বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। চারদিকে পানি, রান্নার কোনো সুযোগ নেই। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে কোথায় যাব, তা বুঝতে পারছি না।’ এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, শুধু জলাবদ্ধতাই নয়, বিশুদ্ধ পানির অভাব তাদের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। টিউবওয়েলগুলো ডুবে থাকায় মানুষ দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে, যা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কক্সবাজারে জুলাই মাসের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত যেখানে ৯২৪ মিলিমিটার, সেখানে মাত্র সাত দিনে ৭০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এটি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। তবে স্থানীয়রা কেবল অতিবৃষ্টিকেই দায়ী করেন না। তাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী দখল এবং স্লুইসগেট পরিচালনার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা এই ভোগান্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ইতোমধ্যে ৩০ লাখ টাকা এবং ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টিই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। জেলায় মোট ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে পাহাড়ধসে ১৭ এবং পানিতে ডুবে ও দেয়াল চাপা পড়ে ৭ জন মারা গেছেন।’
বর্তমানে জেলাজুড়ে ৪৬০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ২২টি কেন্দ্রে মানুষ বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছে এবং তাদের মাঝে শুকনো খাবার, চিড়া ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক স্লুইসগেট বন্ধ থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ রোধ করতে সাময়িকভাবে গেটগুলো বন্ধ রাখা হলেও ভাটার সময় সেগুলো খুলে দেয়া হচ্ছে।
দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে বিত্তবান ও মানবিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। শফিকুল ইসলাম নামে এক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মানবিক সংকটের কথা তুলে ধরার অনুরোধ জানান, যাতে সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি এই প্রান্তিক মানুষের দুর্ভোগের দিকে পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের এই বন্যা পরিস্থিতি কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। পাহাড়ি ঢল থেকে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করতে নদী খনন, পরিকল্পিত স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বনায়ন কর্মসূচি হাতে নেয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে আসায় পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া হবে দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য।
ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপই পারে এই চরম দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে। কক্সবাজারের এই লড়াই শুধু টিকে থাকার নয়, বরং আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর যেখানে প্রয়োজন সম্মিলিত সহানুভূতি ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা।