ভূমিকম্পে ঢাকার কোন কোন এলাকা নিরাপদ?

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম

ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ঢাকা শহরের নির্দিষ্ট কোনো এলাকাকে পুরোপুরি বা তুলনামূলক নিরাপদ বলা যাবে কি না- এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নেই বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, কোনো এলাকার নিরাপত্তা মূলত নির্ভর করে সেই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং ভবনের নিজস্ব কাঠামোগত মানের ওপর।

যদিও শক্ত মধুপুরের লাল মাটির ওপর গড়ে ওঠা কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তবুও ভবনের নির্মাণমান ও দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত ঝুঁকির আসল মাত্রা নির্ধারণ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরের নিরাপত্তা ও ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে হলে প্রধানত দুটি দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

১. শহরের মাটির ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং ২. শহরের সার্বিক অবকাঠামো।

ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ভূতাত্ত্বিক বিষয়টিকে বর্ণনা করে জানিয়েছেন, ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রায় একই রকম।

শহরের বেশিরভাগ অংশ, বিশেষ করে উত্তর দিকের মাটি হলো মধুপুরের লাল মাটি, যেটি প্রাকৃতিকভাবে বেশ শক্ত ও মজবুত।

কিন্তু মোঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পিরিয়ড, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে উত্তর দিকে এবং বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে শহর খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং এই শক্ত লাল মাটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে যায়।

এরপর আবাসন সংকটে শহর বাড়তে শুরু করে পূর্ব ও পশ্চিমে, যেখানে মূলত নরম পলিমাটি এবং নিচু জলাশয় ছিল যা পরবর্তী সময়ে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে।

সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, শুধু যদি মাটির ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করা হয়, তাহলে মধুপুরের লাল মাটির একই গড়নের যেসব এলাকা রয়েছে যেমন- রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও ইত্যাদি এলাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।

কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, শুধু ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর ঢাকার বাসিন্দাদের সার্বিক নিরাপত্তা কোনোভাবেই নির্ভর করছে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী এ প্রসঙ্গে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়ে বলেছেন, “ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ, কোনটি নয়- এটা বলা মুশকিল। যতক্ষণ না ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে, ততক্ষণ বলা যাবে না কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ঝুঁকিমুক্ত।”

অধ্যাপক আনসারীর মতে, আপাতদৃষ্টিতে পুরান ঢাকাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও, নতুন ঢাকা ও পুরান ঢাকার মধ্যে মূল পার্থক্য একটাই, আর তা হলো পুরান ঢাকার অত্যন্ত সরু রাস্তাঘাট।

রাস্তাগুলো সরু হওয়ায় দুর্যোগের সময় সেখান থেকে মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরানো বা ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে পুরান ঢাকার পুরনো কিছু ভবন শত বছরেরও বেশি সময় ধরে বেশ শক্তভাবে টিকে আছে এবং কোনো মাঝারি ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়েনি, তাই মাটির চেয়ে কাঠামোর সঠিক নির্মাণমানই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।

ঢাকার জন্য বড় বিপদ ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’

গবেষকদের মতে, ঢাকার ভেতরের মাটির নিচে সরাসরি কোনো ফল্ট লাইন বা চ্যুতি রেখা নেই, তবে বাংলাদেশের ফল্ট লাইনের জন্য পাঁচটি বড় জায়গা সুপরিচিত। এর বাইরেও কিছু চ্যুতি রেখা আছে, যেগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’।

ব্লাইন্ড ফল্ট হলো এমন এক ধরনের ফল্ট যা ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না, তাই মাটির ওপরে কোনো চিহ্ন না থাকায় সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে এটি সহজে দেখা যায় না বা শনাক্ত করা কঠিন হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে দুটো চিহ্নিত ব্লাইন্ড ফল্ট আছে- একটি ময়মনসিংহে এবং অন্যটি রংপুরে।

যেহেতু এই ফল্ট লাইনগুলো আগে থেকে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব, তাই কোনো ধরনের সতর্কবার্তাও পাওয়া যায় না এবং ঢাকার জন্য ভবিষ্যতে যেকোনো সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এই ব্লাইন্ড ফল্টগুলোই।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএন