অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও ফাঁসের আশঙ্কা থেকেই জোবায়েদকে হত্যা!

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম

প্রায় নয় মাসের তদন্ত শেষে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা মো. জোবায়েদ হোসাইন হত্যা মামলায় তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রেমের সম্পর্কের জটিলতা এবং ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফ হোসেন গত ৩০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে অভিযুক্ত করা হয়েছে ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৯), তাঁর প্রেমিক মাহির রহমান (১৯) এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে (২১)।

পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, মাহির সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন, বর্ষা পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আয়লান সহযোগিতা করেন। তদন্তে বলা হয়েছে, হত্যার আগে প্রায় এক মাস ধরে নজরদারি, ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ, অস্ত্র সংগ্রহ এবং জোবায়েদের চলাফেরা অনুসরণ করা হয়।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার ১৫ নুরবক্স লেনের রৌশান ভিলা ভবনের সিঁড়ি থেকে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ভবনেই তিনি বর্ষাকে গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতে যেতেন। ঘটনার এক দিন পর নিহতের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।

তদন্তে বলা হয়েছে, ঘটনার দিনও জোবায়েদ বর্ষার বাসায় পড়াতে গিয়েছিলেন। এর আগে পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ছিল। এমনকি হত্যার আগের রাতেও দুজনের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কথোপকথন হয়েছিল। ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্ষা কৌশলে জোবায়েদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন, যার কারণে তিনি হত্যার পরিকল্পনার কোনো আভাস পাননি।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্ষা ও মাহিরের মধ্যে আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একপর্যায়ে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি হলে জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে মাহিরের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক আবার শুরু হলে জোবায়েদের কাছে থাকা অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণেই তাঁকে ‘বাধা’ হিসেবে দেখেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

পুলিশের তদন্তে দাবি করা হয়েছে, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনা শুরু হয়। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে মাহির ও আয়লান ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন। পরে তাঁরা দুটি সুইচ গিয়ার ছুরি সংগ্রহ করেন এবং জোবায়েদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ তাঁর লাইভ লোকেশন বর্ষাকে পাঠান। সেই তথ্য পাওয়ার পর মাহির ও আয়লান সেখানে অবস্থান নেন এবং পরে হামলা চালান।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, হামলায় প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা সুইচ গিয়ার ছুরি ব্যবহার করা হয়। ছুরির আঘাতে জোবায়েদের গলার ডান পাশের ক্যারোটিড আর্টারি ও ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। উদ্ধার হওয়া ছুরিতে মাহিরের ডিএনএ পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে ৫০ জন সাক্ষীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফরেনসিক প্রতিবেদন, ডিএনএ পরীক্ষা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আলামত যুক্ত করা হয়েছে।

তদন্তে আরও বলা হয়েছে, হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় জোবায়েদ সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে বর্ষার কাছে যান এবং তাঁকে বাঁচানোর অনুরোধ করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সময় বর্ষা তাঁকে কটূক্তি করেন।

পুলিশের দাবি, হত্যার কয়েক দিন আগে মাহির ও আয়লান জোবায়েদকে হুমকি দিয়েছিলেন এবং বর্ষাকে আর পড়াতে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছিলেন। তবে জোবায়েদ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।

অভিযোগপত্রে মাহিরের জবানবন্দির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বর্ষা তাঁকে নিয়মিত জোবায়েদকে হত্যার জন্য চাপ দিতেন। ধরা পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বর্ষা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তাঁদের পরিবারে অনেক আইনজীবী রয়েছেন। জবানবন্দিতে মাহির আরও দাবি করেন, ছুরি কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের একটি অংশ বর্ষা বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন।

তবে অভিযুক্ত বর্ষার মা আনিকা রহমান দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ে নির্দোষ। তিনি বলেন, আগে যেমন বলেছেন, এখনও বলছেন তাঁর মেয়ে এই ঘটনায় জড়িত নয়।

এদিকে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু জানিয়েছেন, অভিযোগপত্রে মাহিরের বিরুদ্ধে ডিএনএ প্রতিবেদন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। তাঁর মতে, এসব প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি ১৩ জুলাই জিআরও শাখায় পৌঁছায়। পরে আদালত আগামী ১২ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

নিহত জোবায়েদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কুমিল্লা জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তাঁর পরিবার দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে।

এএন