কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফেনীতে পুলিশের দায়ের দায়েরকৃত নাশকতার দুই মামলায় ৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) পর্যন্ত ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া জেলার সদর উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর বাড়িতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁদের মারধর করে তুলে নিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ফেনী মডেল থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) শহরের ট্রাংক রোডে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী ও পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় ফেনী মডেল থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক আল আমিন বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ ও আরও ১০০-১৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তী ২১ জুলাই (রোববার) আবারও সংঘর্ষের ঘটনায় উপ-পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে ২৯ জনের নাম উল্লেখ ও আরও ১৫০-২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
এদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াত-বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যেও রয়েছে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নাম। যদিও শুরু থেকে এর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করে আসছে একযুগের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা এ দলটি নেতারা।
ফেনী জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের দায়ের করা দুই মামলায় জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ১৭ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীরা এফআইআর অন্তর্ভুক্ত নন বলে দাবি করেন তারা।
বিএনপি নেতাদের দাবি, মামলায় উল্লিখিত ঘটনার সময় ফেনীতে অনুপস্থিত ও অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী অনেক নেতাকর্মীকে পুলিশ এই দুটি নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তুলে এনে শারীরিক নির্যাতনের পর গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল সাংবাদিকদের বলেন, সরকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বিএনপি নেতাকর্মীদের গণ-গ্রেপ্তার করছে। গ্রামে গ্রামে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগ- যুবলীগ নেতাকর্মীরা বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে।
তাঁর দাবি, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় দলটির অনেক অসুস্থ ও জেলার বাইরে থাকা অনেককেও গ্রেপ্তার হয়েছে। আবার যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের কারো নাম মামলার এজাহারে নেই। সবমিলিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে চূড়ান্ত বর্বরতা চলছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার বলেন, গত রোববার বিকেলে ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের উত্তর কাশিমপুর গ্রামে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুর নবীর বাড়িতে অভিযান চালায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ । এ সময় তাদের সঙ্গে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা–কর্মীরা তাঁর বাড়িতে যান। তিনি টের পেয়ে নিজ বসতঘর থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রতিবেশীর ঘরে আশ্রয় নেন। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা ওই প্রতিবেশীর ঘরে তল্লাশি চালিয়ে নুর নবীকে ধরে বাড়ির উঠানে মারধর করেন। পরে তাঁকে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় । পরে ডিবি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
শেখ ফরিদ বাহার আরও অভিযোগ করে বলেন,এর আগে শনিবার বালিগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আইয়ুব আলী ও সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের যুবদল নেতা সরওয়ার মুহুরীকেও একই কায়দায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা–কর্মীরা মারধর করে ফেনী থানা-পুলিশে সোপর্দ করেন।
ফরিদ বাহার বলেন, তাঁদের গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।আওয়ামী লীগ ও পুলিশ প্রশাসনের এমন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। অবিলম্বে হামলা, মামলা, গুম, খুন ও নির্যাতন বন্ধ করে গ্রেপ্তারকৃত সকল নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান তিনি।
জেলা বিএনপির দলীয় সূত্রের দাবি, গত ৯ দিনে দলটির গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সাইফুর রহমান রতন, সোনাগাজী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আমিন উদ্দিন দোলন, জেলা যুবদলের সহ-প্রচার সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন আরিফ, সদস্য ইমন, বালিগাঁও ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফ, ছাগলনাইয়া উপজেলা যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন, আবুল কাশেম সোহাগ, ফুলগাজী উপজেলা ছাত্রদল নেতা মো. ইউসুফ, সোনাগাজী মঙ্গলকান্দি ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা মীর মো. আরমান, দাগনভূঞা উপজেলা যুবদল নেতা দ্বীন মোহাম্মদ দিলু, রাজাপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা মো. সজিব, লনাইয়া উপজেলা বিএনপি নেতা শেখ মো. শাহাদাতুল্লাহ, যুবদল নেতা আবদুল্লাহ আল মঞ্জু, মো. ইব্রাহিম, ফেনী সদর উপজেলার সাবেক যুবনেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো, ছাগলনাইয়া পৌরসভার যুবনেতা আবদুল কাদের, সাইফুল হক সজিব, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম শিমুল, দাগনভূঞা রামনগর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা শাফায়েত হোসেন নাদিম, ফেনী পৌরসভার ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিন আহাম্মেদ রতন, সোনাগাজী নবাবপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা মিনহাজুর রহমান ভূঁইয়া শাকিল, ছাগলনাইয়া মহামায়া ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আব্দুল মোমিন, ছাত্রদল নেতা আমির হোসেন ছোটন, মাতুভূঞা ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আলাউদ্দিন আলু, রাজাপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা মো. আরিফুর রহমান, জেলা যুবদলের সদস্য নুরুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, রাজাপুর ইউনিয়ন যুবদল নেতা আবু তাহের কালু, সিন্দুরপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা আরিফুল ইসলাম মুন্না, জায়লষ্কর ইউনিয়ন যুবনেতা নিজাম উদ্দিন, দাগনভূঞা পৌর বিএনপি নেতা নাজমুল হক শাহীন।
এছাড়াও ফুলগাজীর আনন্দপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা আব্দুল নাহিদ, ফরহাদনগর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা আবুল খায়ের, ফুলগাজী উপজেলা যুবদল সদস্য আকবর হোসেন, ফেনী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা আবুল কালাম, ছাগলনাইয়া পৌর ছাত্রদল নেতা মো.শাহাদাত উল্লাহ, ছাগলনাইয়া পৌর বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন, লেমুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মিন্টু, ফেনী সদর উপজেলা মৎস্যজীবী দলের মো. ইউসুফ, পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মোকছেদুর রহমান, ধর্মপুর ইউনিয়ন যুবদল নেতা এমরান হোসেন, সদর উপজেলা যুবদল নেতা কাজী হেলাল উদ্দিন জাহিদ, ছাত্রদল নেতা শাহাদাত হোসেন, কাজীরবাগ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন, মতিগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদল নেতা শিপন এবং ঢাকা তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক জিল্লুর রহমান অনিক।
তবে,জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক একে শহীদ উল্ল্যাহ খোন্দকার বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা মামলা রয়েছে পুলিশ তাদেরই গ্রেপ্তার করছে। এতে আওয়ামী লীগের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও নৈরাজ্য প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ মাঠে রয়েছে। কিন্তু আমাদের জড়িয়ে বিএনপির এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
ফেনী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল বলেন, যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করেছে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে এটি স্বাভাবিক। বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা বা এই ধরনের কোনো কিছুর সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের কোন নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতা নেই। এই ধরনের হিংসাত্মক রাজনীতি আমাদের মধ্যে নেই । আগামীতেও আওয়ামী লীগ হিংসাত্মক রাজনীতি করবে না।
ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) থোয়াই অংপ্রু মারমা বলেছেন, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে তাদেরকেই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নিরপরাধ কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার বা হয়রানি করছে না।তিনি আরও বলেন, নাশকতার দুই মামলায় মঙ্গলবার পর্যন্ত ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
বিআরইউ