স্বপ্ন ছিল ঘরে সুখ ফিরবে। সন্তানরা হাসবে, মা থাকবেন পরম শান্তিতে। সেই স্বপ্ন নিয়েই সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের মুজিবুর রহমান।
কিন্তু বাস্তবতা এখন দুঃস্বপ্ন—কারণ সৌদি আরবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি, আর দেশে ফিরতে চাইলে দাবি করা হচ্ছে ৭ লাখ টাকার মুক্তিপণ।
মুজিবুর ছিলেন ঢাকার মিরপুরে একটি জুতার কারখানার মালিক। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ছোট্ট হলেও সুখের সংসার ছিল। একসময় পরিচয় হয় একই উপজেলার লতিফাবাদ ইউনিয়নের আল-আমীনের সঙ্গে। তিনি স্বপ্ন দেখান—"ভালো ভিসা, ভালো কাজ, খালার রেফারেন্সে সৌদি আরবে পাঠানো হবে।"
পরিবারের উন্নতির আশায় সব কিছু ছেড়ে সৌদি আরবে যান মুজিবুর। কিন্তু বাস্তবে সেখানে পৌঁছেই তার জীবনে নামে বিপর্যয়। কাজ নেই, খাদ্য নেই, থাকার ব্যবস্থাও অনিশ্চিত। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটছে তার প্রতিটি দিন।
আরেক ভুক্তভোগী দুর্জয়ের অভিজ্ঞতাও কম ভয়াবহ নয়। জমি বিক্রি করে তাকেও একই দালাল চক্র সৌদিতে পাঠায়। সেখানে পৌঁছে কোনো কাজ না পেয়ে দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে হয়। শেষমেশ দেশে ফিরতে তাকে দিতে হয়েছে ৫ লাখ টাকার মুক্তিপণ।
তিনি বলেন, “মানুষ বিদেশে গিয়ে টাকা পাঠায়, আর আমি টাকা দিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফিরছি। আমার জীবন শেষ করে দিয়েছে আল-আমীন।”
মুজিবুরের মা অনুফা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “চারটা ঈদ গেছে, নাতিকে একটা জামাও কিনে দিতে পারি নাই। ওরা বাবারে খোঁজে, আর আমি কাঁদি।”
মুজিবুরের ছোট ভাই আবু হানিফ বলেন, “টানাটানির সংসারে ধারদেনা আর জমি বিক্রি করে ভাইরে পাঠাইছিলাম বিদেশে। আজ ভাইয়ের চোখে তাকাতে পারি না। আল-আমীনরে কতবার বলছি, পায়ে ধরছি, তাও সে পাত্তা দেয় না।”
স্ত্রী লিমা আক্তার বলেন, “আল-আমীনের খালার কাছে থাকা অবস্থায় টাকা না পাঠালে মুজিবুরকে মারধর ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। আমার টাকার দরকার নেই, আমি আমার মানুষটা চাই। তিনটা ছেলে-মেয়ে বাবাকে যেন 'বাবা' ডাকতে পারে—এটাই আমার চাওয়া।”
একই দালালের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী রয়েছেন, যারা দেশে ফিরেছেন মুক্তিপণ দিয়ে।
সৌদি থেকে সদ্য ফিরে আসা দুর্জয় জানান, “ভিসার মেয়াদ শেষ হলে ইকামা না দিয়ে ফেলে রাখা হয়। পরে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। মাসের পর মাস জেলে থেকে মুক্তি পেলেও দেশে ফেরার সুযোগ আসে শুধু মুক্তিপণ দিয়েই।”
অভিযুক্ত আল-আমীন নিজের দায় স্বীকার করে বলেন, “আমার মাধ্যমে মুজিবুর ভাইকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু খালা আমার সঙ্গে বেইমানি করেছে। আমি যদি অপরাধী হই, শাস্তি হওয়া উচিত। তবে এখন দেশে আসতে চাইলে মুক্তিপণ দিয়ে আসতে হবে।”
বাংলাদেশের হাজারো পরিবার এই ধরনের প্রবাসী প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে। সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি অনুরোধ, এই ঘটনায় জড়িত দালাল চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। যেন মুজিবুর এবং তার মতো হাজারো মায়ের আর্তনাদ আর না শুনতে হয়।
ইএইচ