চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার আলগী দুর্গাপুর উত্তর ইউনিয়নের নয়ানী গ্রামে প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা ইব্রাহীম মিজিকে ঘিরে মিথ্যা তথ্য প্রচার ও সম্মানহানির চেষ্টা করেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ বিষয়ে একটি গণমাধ্যমে কল্পকাহিনি সাজিয়ে প্রবীণ এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো ঘটনাটিই ভিন্ন। যাদের সঙ্গে ঘটনা সাজানো হয়েছে, তারাই বলছেন মাওলানা ইব্রাহীম এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।
শনিবার সকালে ওই গ্রামের মিজি বাড়িতে গিয়ে কথা হয় মাওলানা ইব্রাহীম, তার ভাতিজা মোক্তার মিজি এবং বিরোধপূর্ণ পক্ষের কয়েকজনের সঙ্গে।
খোঁজ নিয়ে ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাওলানা ইব্রাহীমের ভাতিজা মোক্তার মিজির সঙ্গে প্রতিবেশী সোবহান বিশ্বাস গংদের জমির দখল নিয়ে বিরোধ হয়। সোবহান বিশ্বাস গংরা তাদের নতুন ঘর তোলার জন্য কাজ শুরু করেন। সেখানে মোক্তার মিজি দাবি করেন, তারা তাদের জমিতে ঘরের অংশ পাকা করছেন বিধায় ইট খুলে ফেলেন। এতে উভয়পক্ষে একপর্যায়ে মারামারি হয় এবং উভয়পক্ষের কয়েকজন আহত হন।
কিন্তু এই ঘটনাটির তথ্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। ওই চক্রটি প্রচার করে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে সম্পত্তি বিষয়ক বৈঠকে মাওলানা ইব্রাহীম ভাড়াটে সন্ত্রাসী এনে তার ভাতিজাদের মধ্যে তিনজনকে হত্যাচেষ্টা করেন ও আহত করেন। আহত হিসেবে উল্লেখ করা হয় কালু মিজি, মিজান মিজি ও সাইফুল মিজিকে।
এই বিষয়ে আহতদের ভাই মোক্তার মিজি বলেন, আমাদের সঙ্গে আমার চাচা ইব্রাহীম মিজির কোনো বিরোধ নেই। বিরোধ হয়েছে সোবহান বিশ্বাসদের সঙ্গে। তারা আমাদের জমির অংশ দখল করে ঘরের কাজ করছিল, তাই আমি ইট খুলে ফেলি।
এদিকে, ঘটনায় জড়িত সোবহান বিশ্বাসের স্ত্রী ফাহিমা বেগম ও নজরুল বিশ্বাসের স্ত্রী আছমা বেগম বলেন, আমরা ত্রিশ বছর আগে নদীভাঙনের শিকার হয়ে এখানে এসে বাড়ি করেছি। আমাদের সামনে মোক্তার মিজিদের জমি থাকায় তারা ইট খুলে ফেলেন এবং আমাদের মারধর করেন। পরে ৯৯৯-এ কল দিলে পুলিশ এসে উদ্ধার করে।
মাওলানা ইব্রাহীম মারামারির সঙ্গে জড়িত কিনা জানতে চাইলে ফাহিমা ও আছমা বলেন, তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। বরং তার দুই ছেলে উভয়পক্ষকে থামানোর চেষ্টা করেছেন।
মাওলানা ইব্রাহীম বলেন, ঘটনার সময় আমি পাশেই বসা ছিলাম। তখন আমার হাত থেকে লাঠি নিয়ে মোক্তারদের পক্ষের লোকজন এসে মারামারি করে। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।
তার বড় ছেলে হাবিব মিজি বলেন, ঘটনার সময় আমরা উপস্থিত থেকে উভয়পক্ষকে থামানোর চেষ্টা করি। কিন্তু মোক্তার মিজির ভাইরা আমার বৃদ্ধ বাবার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত মোক্তার মিজি ও সোবহান বিশ্বাস গংদের মধ্যে বিরোধ। দুই পক্ষের বিরোধে মাওলানা ইব্রাহীম মিজির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
যেখানে মাওলানা ইব্রাহীমের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, সেখানে তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার কেন হচ্ছে? অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এর পেছনের মূল রহস্য।
মাওলানা ইব্রাহীম বলেন, মিজি বাড়ি দুই ভাগে বিভক্ত এবং দুই বাড়ির লোকজন মিলেই সম্পত্তির মালিক। সম্পত্তির পরিমাণ ৬ একর ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে আমাদের বাড়ির অংশ ৩ একর ৭.৫ শতাংশ। আমি যে বাড়িতে থাকি, তার অংশের তিন ভাগ আমার। পৈতৃক সম্পত্তির আরএস ও সিএস খতিয়ান অনুসারে আক্তার মিজিদের প্রাপ্ত অংশ ৭১.৬৬ শতাংশ। বাকি অংশীদার আমি ও সবুর মিজি সমান অংশে মালিক।
আক্তার মিজি গংরা ইতোমধ্যে ২৮.৬২ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেছেন। তাদের বাকি আছে ১৮.৪ শতাংশ। সবুর মিজি বিক্রি করেছেন ২৮.৬২ শতাংশ, তার আছে ৪৬.০৪ শতাংশ। আমি (ইব্রাহীম) কোনো সম্পত্তি বিক্রি করিনি। আমার পৈতৃক ও ক্রয়কৃত সম্পত্তি মিলিয়ে ২ একর ৫৮ শতাংশ জমি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই জমির মধ্যে সোবহান বিশ্বাসদের কাছে ৩৭.৫ শতাংশ জমি লিখে দিয়েছি। তারা নদীভাঙনের পরে এখানে থাকলেও জমি লিখে নেয়নি। তিন বছর আগে আমি লিখে দিই। সেই জমিতে ঘর নির্মাণের সময় মোক্তারদের সঙ্গে তাদের বিরোধ হয়।
তিনি বলেন, বিএস খতিয়ানে আমার ভাতিজা আক্তার মিজিদের নামে প্রায় ২০ শতাংশ জমি বেশি ওঠে, আমার কম ওঠে। তারা দীর্ঘদিন ধরে আমার এই জমি ভোগ দখল করে আসছে। একবার হজে যাওয়ার সময় তারা ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আমাকে জমির দাবি ছেড়ে দিতে অনুরোধ করে। তবে আমি কখনো তাদের সঙ্গে বিবাদে যাইনি, যদিও তাদের পরিবারের মহিলা সদস্যরা আমাকে প্রায়ই গালমন্দ করে।
জানা গেছে, আক্তার মিজি গংদের অতিরিক্ত জমি ভোগদখল বিষয়ে স্থানীয় এক আমিন দিয়ে জমি মাপা হলেও সমাধান হয়নি। এক সময় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার জন্য ৫০ টাকার দুইটি স্ট্যাম্পে বণ্টনের চুক্তি দেখানো হয়। তবে আক্তার মিজি গংরা সেখানে জালিয়াতি করে স্বাক্ষরের পর অতিরিক্ত লেখা যুক্ত করেন।
এ বিষয়ে আগেও ইউনিয়ন পরিষদে এক বৈঠক হয়, যেখানে পরিষদের প্যাডে উল্লেখ করা হয় যে, আক্তার মিজিদের দখলে অতিরিক্ত ১৮.১৭ শতাংশ জমি রয়েছে। ওই সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা স্বাক্ষর করলেও আক্তার মিজি গংরা স্বাক্ষর না করে চলে যান।
এদিকে, আক্তার মিজি গংদের হুমকি-ধমকির কারণে ২৭ সেপ্টেম্বর হাইমচর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন মাওলানা ইব্রাহীম মিজির বড়ো ছেলে হাবিবুর রহমান মিজি।
জেএইচআর