১১ কোটি টাকা খরচে নির্মিত টানেলই যেন এখন দুর্ভোগের নাম

বান্দরবান প্রতিনিধি প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২৫, ০৩:৫৭ পিএম
  • টানেলের ভিতরে স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তা, খানা-খন্দ ও যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং
  • বৈদ্যুতিক লাইন না থাকায় অন্ধকারে ভুতুরে পরিবেশ
  • বরাদ্দ না থাকায় সংস্কার করতে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষ

'বান্দরবান বাস টার্মিনাল টানেল'। বাসস্ট্যান্ড থেকে হাফেজঘোনা কেন্দ্রীয় পৌর বাস টার্মিনালে যাওয়ার বিকল্প এ সড়কটি একসময় স্থানীয় পথচারী, যাত্রীসহ যানবাহন চালকদের কাছে ভোগান্তির অন্যতম স্থান ছিল। কিন্তু সেখানে টানেল নির্মাণের পর স্থানটি সরাসরি কোনো বিনোদনকেন্দ্র না হলেও পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয়দের কাছে দর্শনীয় স্থান হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়েছিল। 

কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে টানেলের ভিতরের রাস্তায় কাদাপানি জমে ও ঢালাই উঠে গিয়ে খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় তা এখন জনদুর্ভোগে রূপ নিয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বলছে, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় উদ্বোধনের পর থেকে টানেলের কোনো ধরনের সংস্কার করা হয়নি। তবে এ বছরে টানেলটি সংস্কার করা হবে এবং সংস্কার শেষে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চুক্তির মাধ্যমে টানেলসহ বাস টার্মিনাল পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হবে। এতে সৃষ্টি হওয়া জনদুর্ভোগ লাঘব হবে।

জানা গেছে, যানজট নিরসন, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে ২০১৮ অর্থবছরে প্রথম ধাপে বান্দরবান বাস টার্মিনাল টানেলের স্থাপনার কাজ শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। পরে ২০২০ সালে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০০ ফুট দীর্ঘ এ টানেলটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালে শেষ হয়। যা ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর টানেলের উদ্বোধন করেন তৎকালীন পার্বত্যবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভিতরে ঘোর অন্ধকার। টানেলের দুই প্রান্ত থেকে ছোট-বড় অনেক গাড়ি হেডলাইট জ্বেলে টানেলের ভিতর প্রবেশ করছে আর বেরিয়ে যাচ্ছে। ভিতরে বিভিন্ন স্থানে ঢালাই উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে গর্ত। গর্তগুলোতে জমে আছে পানি। রাস্তাগুলো কাদায় ভরা ও স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে। দেয়ালে বিভিন্ন অংশে কাদাযুক্ত পানির ছাপ। দেয়ালের দুই স্থানে প্লাস্টিকের পাইপ দেওয়া রয়েছে। তবে কেন এবং কারা পাইপগুলো বসিয়েছে তা জানেন না স্থানীয়রা।

টানেলের পাশেই রয়েছে সাঙ্গু উচ্চ বিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে কয়েকশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তারা প্রতিদিন যাতায়াত করে টানেলের পথ দিয়ে। টানেলের পথে চলাচল করতে গিয়ে বর্ষা ও শুষ্ক— দুই মৌসুমেই তাদের রীতিমতো ভোগান্তি পোহাতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে বৃষ্টি হলে টানেলের দেয়ালের বিভিন্ন অংশ দিয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ত। কিন্তু বর্তমানে দু’টি স্থানে ঝরনার মতো পানি পড়ছে। এতে টানেলের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে কাদাযুক্ত স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তা ও খানা-খন্দ। ফলে দিন যতই যাচ্ছে, টানেলটি ততই জনদুর্ভোগে পরিণত হচ্ছে। পর্যটকসহ স্থানীয়রা বলছেন, এ স্থাপনার বাহ্যিক নান্দনিকতার বিপরীতে ভেতরের অবস্থা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, টানেলের ভিতরের রাস্তাজুড়ে কাদামাখা পানি জমে থাকে। তবুও বাধ্য হয়ে পথচারীদের এ পথ দিয়ে চলাচল করতে হয়। শুষ্ক মৌসুমেও যানবাহন চলাচলের সময় ধুলো-বালি উড়ে একই ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের।

সাঙ্গু উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন ও নাহিদ জানায়, টানেলের ভিতরের রাস্তা একদম পরিষ্কার না। বাতিগুলো জ্বলে না, তাই টানেলজুড়েই অন্ধকার থাকে। স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তার কারণে সবসময় সাপের ভয় থাকে। মোট কথা— এ টানেল দিয়ে চলাচল করতে গেলে ভয়ের আশঙ্কা থেকেই যায়।

টানেল এলাকার বাসিন্দা সরওয়ার কামাল বলেন, বর্তমানে টানেলটি গাড়ি পার্কিং ছাড়া আর কোনো উপকারে আসছে না। এত টাকা খরচ করে টানেলের যদি এই পরিস্থিতি হয়, তাহলে জনগণের উপকারটা কোথায়? জনগণের টাকা এভাবে অপচয় করা ঠিক হয়নি।

আব্দুর রশিদ নামে আরেকজন বাসিন্দা জানান, টানেলের উপরে কেটে ফেলা বিশাল পাহাড়ের মাটি যেভাবে ধসে পড়ছে টানেলের ছাদের উপর, তাতে টানেলটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে আছে। বর্ষায় দেয়ালের বিভিন্ন অংশ দিয়ে ঝরনার মতো পানি পড়ছে। ফলে টানেলটি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং টানেলের ছাদ ধসে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এদিকে টানেল নির্মাণের শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, সিডিউল অনুযায়ী কাজ না হওয়া এবং কর্তৃপক্ষের তদারকিতে অবহেলার অভিযোগ ওঠে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। তাই টানেলের স্থায়িত্ব নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, দক্ষ প্রকৌশলী টিম এনে টানেলটি পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে সার্বজনীন ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে।

এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন ইয়াছির আরাফাত বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা সার্বক্ষণিক তদারকিতে ছিলেন। টানেল নির্মাণকাজে কোনো রকম অনিয়ম হয়নি। দেয়াল বেয়ে যে পানি পড়ছে, তা আসলে টানেলের কানেকশনে আরসিসি ঢালাইয়ের জয়েন্টগুলো থেকেই হচ্ছে। অনেকে না বুঝে টানেল ফেটে পানি পড়ছে বলে অভিযোগ করছেন।

তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণ শেষে কয়েক বছর পর পর সংস্কারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু টানেল নির্মাণের পর থেকে বরাদ্দ না থাকায় তা করা যায়নি। এছাড়া উদ্বোধনের সময় যে লাইটগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও চুরি হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত টানেল থেকে ছয়বার তার চুরি হয়েছে। এছাড়া মাটি ধস রোধে জিও ব্যাগ ব্যবহার করেছিলাম, সেগুলোও রাতে চুরি হয়ে গেছে। তবে এ বছর যাবতীয় সংস্কার শেষে টানেল ও কেন্দ্রীয় পৌর বাস টার্মিনাল পৌরসভার সাথে চুক্তির মাধ্যমে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। প্রক্রিয়া চলমান আছে।

ইএইচ