সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলিতে স্বচ্ছতা আনতে বাংলাদেশ সরকার অনলাইন আবেদন ও স্কোরভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করেছে। এই নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষকদের কর্মস্থলের দূরত্ব, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থা (যেমন বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত নারী, প্রতিবন্ধিতা) ইত্যাদি বিবেচনায় স্কোর দেওয়া হয় এবং সর্বোচ্চ স্কোর পাওয়া শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান।
কিন্তু নাটোরের লালপুর উপজেলায় এই নিয়ম অনুসরণ না করে উপজেলা শিক্ষা অফিসার (ইউইও) নার্গিস সুলতানার বিরুদ্ধে ইচ্ছেমতো বদলির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, স্কোরে পিছিয়ে থাকা কিছু শিক্ষককে বিশেষ সুবিধা দিয়ে বদলি করা হয়েছে, যেখানে নিয়ম অনুযায়ী অগ্রাধিকার পাওয়া শিক্ষকরা বাদ পড়েছেন।
স্কোরে প্রথম হলেও বদলি হয়নি পালিদেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. শিলা খাতুন।
তিনি বলেন, "আমি বিদ্যালয় থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে থাকি। অনলাইন স্কোরে আমি প্রথম হয়েছিলাম। কিন্তু আমার বদলি হয়নি। নিয়ম মানলে বদলি হওয়ার কথা ছিল আমার।"
স্কোরে পিছিয়ে থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ বদলি হয়েছে জিয়াউর রহমানের। অভিযোগ রয়েছে, স্কোর তালিকায় তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে থাকা জিয়াউর রহমান বদলির সুযোগ পেয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমি অনলাইনে আবেদন করি, পরে রেজাল্ট হয়, তাতেই আমি বদলি হই। কিভাবে আমি চতুর্থ স্কোর থেকে বদলির সুযোগ পেয়েছি, তা বলতে পারবো না।"
স্থানীয় শিক্ষক সমাজের মতে, এটি স্পষ্ট করে দেয় যে বদলির নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।
এদিকে সহকারী শিক্ষা অফিসার ও হিসাব সহকারীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সহকারী শিক্ষা অফিসার (এটিও) ঝর্নার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, তিনি যাচাই-বাছাই না করেই কিছু আবেদনকে ‘অনুমোদনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমরা নির্দিষ্ট কার্যদিবসে কিছু না লিখলেও আবেদনটি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আইডিতে চলে যায়। আমাদের করনীয় নেই।"
উপজেলা শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী-কাম হিসাব রক্ষক তৈমুর রহমানের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন একই জায়গায় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। অনেকে অভিযোগ করেন, তাকে ‘সন্তুষ্ট’ না করলে কাজ আটকে যায়।
তবে তৈমুর রহমান দাবি করেন, "এখন বেশিরভাগ কাজ অনলাইনে হওয়ায় আমার হাতে তেমন কিছু থাকে না। আমি দুই-এক দিনের মধ্যে কাজ করে দেই, কাউকে হয়রানি করি না এবং কোনো অনিয়মে জড়িত নই।"
অনলাইনে বদলি আবেদনে যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম ধাপ প্রধান শিক্ষক তার দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কী না এমন প্রশ্নে সবুজছায়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাসনুভা আলম বলেন, "শিক্ষক জিয়াউর রহমান তার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট দিলে আমি তা যাচাই-বাছাই করে স্বাক্ষর করি। তিনি কোনো মিথ্যা তথ্য দেননি।"
উপজেলা শিক্ষা অফিসার নার্গিস সুলতানা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "বদলির আবেদন অনলাইনে হয়, আমি কেবল ‘অনুমোদনযোগ্য’ বা ‘প্রত্যাখ্যানযোগ্য’ হিসেবে মন্তব্য দিই। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেন সহকারী শিক্ষক ও এটিও। স্কোর আমরা বদলি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেখতে পাই না। আমি সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছি।"
তিনি আরও বলেন, "তৈমুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। কেউ আমার নাম ভাঙিয়ে কিছু করলে তার দায় আমার নয়। আমি বরং সবাইকে সচেতন করি এবং অনিয়মের বিষয়ে আমাকে গোপনে জানানোর অনুরোধ করি। তবে তার বিষয়ে আমিও শুনেছি, বিষয়টি দেখব।"
স্থানীয় শিক্ষক সংগঠনের এক নেতা বলেন, "স্কোরভিত্তিক অনলাইন বদলি চালুর উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি নিয়ম না মানা হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থারই মূল্য থাকবে না।"
এমন অনিয়মের বিষয়ে লালপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি আব্দুল মোত্তালেব রায়হান অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, "যোগ্য শিক্ষক বদলির সুযোগ না পেলে ক্লাসে শিক্ষার মান প্রভাবিত হবে। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।"
অভিভাবক কুতুবউল আলম বলেন, "শিক্ষকদের মানসিক অস্থিরতা ও অবিচার সরাসরি শিক্ষার পরিবেশে প্রভাব ফেলে। এতে ছাত্রছাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।"
নাটোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিইও) মোহা. আব্দুল হান্নান জানান, "বদলি একটি সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন ও স্কোরভিত্তিক যাচাই-বাছাই করার কথা। কেউ যদি নিয়ম ভঙ্গ করে থাকেন, তাহলে সেটা তদন্তযোগ্য বিষয়। আমরা অভিযোগ পেলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখি এবং প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি।"
তিনি আরও বলেন, "স্কোরে পিছিয়ে থেকেও যদি কেউ অগ্রাধিকার পান, তাহলে সেটা কেন ঘটেছে তা যাচাই করতে হবে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব। কেউ যেন বঞ্চিত না হন, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।"
ইএইচ