স্কুলভিত্তিক টাইফয়েড টিকাদান: নিরাপত্তা ও সচেতনতা কোথায় সীমাবদ্ধ?

মিরাজ আহমেদ, মাগুরা প্রকাশিত: অক্টোবর ৮, ২০২৫, ১২:৫৪ পিএম

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শুরু হতে যাচ্ছে দেশব্যাপী টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫। সরকার ঘোষণা দিয়েছে, আগামী ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দেওয়া হবে বিনামূল্যে টাইফয়েড টিকা।

তবে দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে এই টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে: টিকার নিরাপত্তা, সচেতনতার ঘাটতি, রেজিস্ট্রেশন জটিলতা এবং মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি নিয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৯০ লাখ মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজারের মৃত্যু ঘটে। আক্রান্তদের বড় অংশই দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার মানুষ।

গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (GBD) এর ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৪ লাখ ৭৮ হাজারেরও বেশি মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয় এবং ৮ হাজার জনের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে ৬৮ শতাংশই শিশু। 

টাইফয়েড ক্যাম্পেইনে টিকা প্রদান কার্যক্রমের সময়কাল ১২ অক্টোবর ১৩ নভেম্বর ২০২৫ সালের মোট ১৮ কর্মদিবস। ১ম পর্যায় (১২-৩০ অক্টোবর) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে ক্যাম্পেইন (যে কোন ১০ কর্মদিবস) এবং পরবর্তী পর্যায় (১-১৩ নভেম্বর) কমিউনিটিতে (গ্রামাঞ্চল এবং নগরাঞ্চলে নিয়মিত এবং স্বামী টিকাদান কেন্দ্রে ক্যাম্পেইন) (যে কোন ৮ কর্মদিবস) প্রতিটি টিকাদান টিমে টিকাদান কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের “টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫”কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন “সময়োপযোগী ও জীবনরক্ষাকারী উদ্যোগ”।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, স্কুলভিত্তিক এই টিকাদান কার্যক্রমে শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রেণি অনুযায়ী টিকাদানের সময়সূচি নির্ধারণ হবে। শিক্ষার্থীদের নাম, বয়স ও জন্মনিবন্ধনের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে ওয়েবসাইটে: www.vaxepi.gov.bd এ প্রসঙ্গে মাগুরা জেলা তথ্য অফিসার পাভেল দাস বলেন, “প্রত্যেক শিক্ষক যেন রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করেন এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

তবে মাঠপর্যায়ে অনেক শিক্ষক জানাচ্ছেন, ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কারণে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় ভোগান্তি হচ্ছে। শালিখা উপজেলার এক শিক্ষক আব্দুর রশিদ বলেন, “আমাদের স্কুলের অনেক শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। ফলে অনেকে রেজিস্ট্রেশন করতে পারছে না, এতে ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।”তবে টিকার নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টাইফয়েড টিকায় ব্যবহৃত Typhoid Conjugate Vaccine (TCV) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ও “প্রি-কোয়ালিফায়েড” টিকা।এটি পাকিস্তান,নেপালসহ বিশ্বের বহু দেশে সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. মো.শামীম কবির বলেন,“টিসিভি অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর। খুব সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া,যেমন টিকা দেওয়ার স্থানে ব্যথা বা অল্প জ্বর হতে পারে, যা স্বাভাবিক। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।” তবে অতীতে বিভিন্ন টিকাদান ক্যাম্পেইনে ‘অজ্ঞান হওয়া’ বা ‘অসুস্থ বোধ করা’ শিক্ষার্থীদের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা একে Mass Psychogenic Illness বলে ব্যাখ্যা করেন—এটি মূলত মানসিক ভীতিজনিত প্রতিক্রিয়া, টিকার কারণে নয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগ ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের সমন্বয় সভা শুরু হলেও মাঠ পর্যায়ে এখনো অনেক জায়গায় প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ।

মাগুরা সদর উপজেলার এক স্বাস্থ্য সহকারী জানান,“আমাদের কাছে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন তালিকা সময়মতো না আসায় পরিকল্পনা করা কঠিন হচ্ছে। স্কুলগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও দুর্বল।”

অন্যদিকে অভিভাবকরা বলছেন, প্রচারণা কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয়। শহরে কিছু ব্যানার দেখা গেলেও গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা কম।অভিভাবক রুবিনা খাতুন বলেন, “আমরা জানতাম না স্কুলে টাইফয়েড টিকা দেওয়া হবে। আগে থেকেই জানালে আমরা শিশুদের প্রস্তুত করতে পারতাম।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাইফয়েড টিকা কার্যকর হলেও শুধুমাত্র টিকাদানই যথেষ্ট নয়। নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সংক্রমণ ঝুঁকি থেকে যায়।

মো. আব্দুল কাদের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক); উপপরিচালক,স্থানীয় সরকার (অতিরিক্ত দায়িত্ব)বলেন, “টাইফয়েড একটি ‘ওয়াটার-বোর্ন’ রোগ। তাই শুধু টিকা নয়, পানি ও খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকাদানের সময়সূচি নির্ধারণ করবেন এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের সহায়তায় টিকা প্রদান করবেন। তবে বাস্তবায়নে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা প্রশাসক মো. অহিদুল ইসলাম বলেন, “টিকা কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম বা অবহেলা সহ্য করা হবে না। সবাই মিলে কাজ করলে ক্যাম্পেইন সফল হবে।”

টাইফয়েড এখনো বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যের বড় হুমকি। সরকারের এই টিকাদান ক্যাম্পেইন নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে জনসচেতনতা, সমন্বয় ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।যতক্ষণ পর্যন্ত পরিষ্কার পানি, নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাত্রা নিশ্চিত না হয়, ততক্ষণ টাইফয়েডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলবেই।আর তাই টিকার পাশাপাশি সচেতনতা ও দায়িত্ববোধই হতে পারে টেকসই সুরক্ষার চাবিকাঠি।

জেএইচআর