“ঘরে যে একটু গৈড় দিবো পানি পড়ে। পালি দলচি পাত্যি থুই”—কাঁপা কণ্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ে রাহেলা বেগমের। বয়স ৭৩ বছর।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার খন্দকার মালঞ্চি গ্রামের এই নারী একসময় ছিলেন হাস্যরস ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এক সংসারের গৃহিণী। আজ তিনি একা, নিঃস্ব, ভিটেমাটি হারা।
গ্রামের মানুষ একসময় স্নেহভরে ডাকতেন তাকে “রাহেলা সুন্দরী” নামে। শত বিঘা জমির মালিক ছিল তার শ্বশুর-শাশুড়ি। ধান-চালের ভাঁড়ার, গোয়ালে গরু, পুকুরে মাছ—সবই ছিল একসময়ের ঐশ্বর্যময় পরিবারের সম্পদ। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সব। এখন রাহেলার নামে এক শতক জমিও নেই।
স্বামী আক্কাস আলী মারা গেছেন বহু বছর আগে। তিন সন্তানের একজন পনের বছর আগে মারা গেছে, মেয়েটি বিবাহিত, আর একমাত্র জীবিত ছেলে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছে। কিছুদিন ছেলের ঘরে ছিলেন রাহেলা। কিন্তু সেই ঘর ছেলের স্ত্রীর নামে থাকায়, একসময় তাকে বের করে দেওয়া হয়। ভেঙে ফেলা হয় মাথার ওপরের শেষ ছাদটুকুও।
এরপর গ্রামের সহৃদয় ব্যক্তি হানিফুর রহমান গেন্দা তাকে নিজের বাগানের এক কোণে থাকতে দেন। সেখানে পাটখড়ি, ছেঁড়া টিন আর বাঁশ দিয়ে একটি ছোট ছাপড়া ঘর তুলেছেন তিনি। ঘরটির অবস্থা শোচনীয়—টিনে ছিদ্র, বেড়া নড়বড়ে, সামান্য বৃষ্টিতেই পানি পড়ে ঘরে।
রাতে ভয় পেয়ে জেগে থাকেন রাহেলা। “বাতাসে বেড়া নড়ে, শব্দ হয় টিনের। যদি চুরি হয়, কেউ জানতেও পারবে না,”—বললেন তিনি।
বাবার বাড়ি একই উপজেলার নূরপুর মালঞ্চি গ্রামে। বাবার রেখে যাওয়া দুই বিঘা জমিতে তার অংশ ছিল, কিন্তু সেটিও অন্যের দখলে। স্বামী নিরক্ষর হওয়ায় পৈত্রিক সম্পত্তিও বুঝে নিতে পারেননি।
“আমার জমি লিয়া ওরা হরিলুট করি খায়। আর আমি মাইশের দুয়ারে দুয়ারে হাত পাতি,”—বললেন তিনি, মুখে কোনো ক্ষোভ নয়, ছিল কেবল এক নিঃশেষ ক্লান্তি।
বর্তমানে সরকারের কাছ থেকে মাসে ৫০০ টাকা বিধবা ভাতা পান রাহেলা। বাকিটা চলে মানুষের দয়ার ওপর। সকালে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চাল-ডাল সংগ্রহ করেন। কখনো অন্যের বাড়িতে খাওয়া হয়, কখনো অনাহারেই দিন কাটে।
তাকে গুচ্ছগ্রামে নেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে, কিন্তু যেতে চান না। “আমি গুচ্ছগ্রামে যেতে পারতিচিনি। এখানে পাড়াপিত্তবাশিরা আছে। কিছু হলে ওরাই তো দেকে আমার মেয়েকে খবর দেয়।”
তিনি চান, যেখানে আছেন সেখানেই সরকারি সহায়তায় একটি ছোট টিনের ঘর—যেখানে বৃষ্টি পড়বে না, শীত লাগবে না, অন্তত রাতের ঘুমটা নিশ্চিন্ত হবে।
প্রতিবেশী রেনুয়ারা বেগম বলেন, “রাহেলা একজন অসহায় মানুষ। প্রতিদিনই কারো না কারো বাড়ি যান সহযোগিতার জন্য। এমন অবস্থায় কেউ যেন না পড়ে, সেই ব্যবস্থা করা জরুরি।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইমরান আলী জানান, “উনি বিধবা ভাতা পান, কিন্তু কষ্টে দিন যায়। সরকারি সুযোগ সীমিত, তবুও তার জন্য কিছু করা যায় কি না চেষ্টা করব।”
গ্রামের সমাজপ্রধান রেজাউল করিম বলেন, “বৃদ্ধ বয়সে রাহেলা বেগম খুব কষ্টে আছেন। সরকারি সহায়তা পেলে হয়তো তার জীবনটা একটু স্বস্তির হতো।”
রাহেলা বেগমের একটাই চাওয়া—একটি ছোট, নিরাপদ টিনের ঘর। যেন বৃষ্টির পানি মাথার ওপর না পড়ে, যেন শীতের রাতে কাঁপতে না হয়, যেন জীবনের শেষ ক’টা রাত অন্তত শান্তিতে ঘুমানো যায়।
রাহেলার গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়—এমন হাজারো রাহেলা বেগম ছড়িয়ে আছেন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেঁচে আছেন দুর্বিষহ বাস্তবতায়।
যদি এই প্রতিবেদন কোনো সংবেদনশীল পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, যদি কোনো দায়িত্বশীল প্রশাসকের টেবিলে পৌঁছে—আর তাতে রাহেলার একটি ঘর হয়—তাহলে সেটিই হবে এই লেখার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ইএইচ