দিনাজপুরের তিন বছরেও শেষ হয়নি মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ

দিনাজপুর প্রতিনিধি প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৫, ০৫:৩০ পিএম

সরকারের দেশব্যাপী মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় নির্মাণাধীন মডেল মসজিদের কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নির্মাণ কাজের ধীরগতির কারণে স্থানীয় মুসল্লি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। উপজেলা সদরে দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কাজ শুরু হলে এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দেয়। তবে বর্তমানে কাজের গতি অত্যন্ত হতাশাজনক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির বেশিরভাগ কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। প্রকল্প এলাকায় শ্রমিকদের উপস্থিতিও খুবই কম। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণেই প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত হচ্ছে।

দিনাজপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, চিরিরবন্দর মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের চুক্তিমূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ২৬ জুন ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয় এবং কাজ শুরু হয় ওই বছরের ২৬ নভেম্বর। এটি ১২ মাসের প্রকল্প ছিল, যা ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনাগ্রহের কারণে কাজ ব্যাহত হয়। আমি আগস্টে এই দপ্তরে যোগ দেওয়ার পর দেখি কাজের গতি প্রায় থেমে গেছে। ঠিকাদারকে চিঠি দিয়ে কাজের পরিকল্পনা (ওয়ার্ক প্ল্যান) চাওয়া হয়, কিন্তু নির্ধারিত সময়েও অগ্রগতি হয়নি। অক্টোবর মাসের মধ্যে একটি ছাদ ঢালাই করার কথা থাকলেও তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে গত ২০ তারিখে ঠিকাদারকে চুক্তি লঙ্ঘনের দায়ে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তি বাতিলের প্রস্তাবও প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে।

স্থানীয় মুসল্লি জলিল বলেন, আমরা ভেবেছিলাম দ্রুতই এই সুন্দর মসজিদে নামাজ পড়তে পারব। এটি শুধু মসজিদ নয়, এখানে লাইব্রেরি ও ইসলামিক সংস্কৃতির কেন্দ্র হওয়ার কথা। কিন্তু যেভাবে কাজ চলছে, তাতে মনে হয় আরও অনেক সময় লাগবে।

স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ জানান, প্রথমদিকে কাজের গতি ভালো থাকলেও কয়েক মাস ধরে কার্যত বন্ধ। এতে নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থেকে ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সাইট ইঞ্জিনিয়ার রিমন বলেন, কাজের অগ্রগতি মোটামুটি ৩০ শতাংশ। দেরির মূল কারণ হলো, আমরা সাইট বুঝে পেয়েছি দেরিতে-২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। এতে প্রায় ছয় মাসের গ্যাপ তৈরি হয়। কাজটি এখন ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ শেষ হতে পারে। টাইম এক্সটেনশনের আবেদন দেওয়া হয়েছে; তা অনুমোদন পেলে সঠিক সময় জানানো সম্ভব হবে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই প্রকল্পটি চিরিরবন্দরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর নির্মাণে বিলম্ব সরকারের একটি ভালো উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বরাদ্দ সংক্রান্ত কিছু জটিলতা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

এলাকাবাসী আরও দাবি করেন, ঠিকাদার শাহ আলম স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে আছেন, ফলে কাজও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে তার ভাগিনা সোহাগ ও ম্যানেজার মসজিদের নির্মাণকাজের তদারকি করছেন।

চিরিরবন্দরের ধর্মপ্রাণ মানুষ আশা করছেন, সকল জটিলতা নিরসন করে কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করবে এবং এটি ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে এলাকাবাসীর জন্য উন্মুক্ত হবে।

জেএইচআর