ফেনীতে দুর্গ ফিরে পেতে চায় বিএনপি, ভাগ বসাতে তৎপর জামায়াত

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, ফেনী প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৫, ০৩:১২ পিএম

দেশের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফেনী অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এ জেলার তিনটি সংসদীয় আসন বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও এবার এখানে ভাগ বসাতে তৎপর জামায়াত। 

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকটি নির্বাচনে এখানে সরকার দলীয় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। তাই এবারের নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ পুরোপুরি ভিন্ন। ইতোমধ্যে পুরনো দুর্গ ফিরে পেতে তিনটি আসনেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

এদিকে কেন্দ্র ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থীরা তিনটি আসনেই প্রচারণা চালিয়ে মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। 

এছাড়া দলীয় অবস্থান জানান দিতে চেষ্টা করছে ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, এবি পার্টিসহ জুলাই বিপ্লবের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো। তবে ফেনীতে এখনও পর্যন্ত কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি এনসিপি। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে গণঅধিকার পরিষদ।

ফেনী-১ (পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া) আসনটি বেগম খালেদা জিয়ার আসন হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালে ফেনী-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। 

এবারও আসনটিতে খালেদা জিয়াকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান দলটির তৃণমূল নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে শারীরিক কারণে বেগম জিয়া নির্বাচন করতে সক্ষম না হলে এখানে ধানের শীষের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বেগম জিয়ার পুত্রবধূ সৈয়দা শামীলা রহমান, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির গ্রাম সরকারবিষয়ক সহ-সম্পাদক বেলাল আহমেদ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, প্রয়াত সাঈদ ইস্কান্দারের ছেলে ব্যারিস্টার শামস ইস্কান্দার ও বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনুর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে প্রচারণায় রফিকুল আলম মজনু এগিয়ে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।

সীমান্তবর্তী এ আসনে ১৬ বছরের আওয়ামী দু:শাসনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অ্যাডভোকেট এসএম কামাল উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে লড়বেন। ইতোমধ্যে দলীয় ও বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে প্রচারে এগিয়ে রয়েছে দলটি। 

এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা মাওলানা ফরিদ উদ্দিন আল মোবারক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (মামুনুল হক) জেলা সভাপতি মাওলানা নাজমুল আলম এবং খেলাফত মজলিসের জেলা যুগ্ম আহবায়ক মাওলানা আবদুল আজিজ আহমদীকে নিজ নিজ দলের একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

ফেনী-২ (সদর) আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। গত রোববার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে ফেনী-২ ও ফেনী-৩ আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপি।

বৈঠকে কাউকে সবুজ সংকেত না দিলেও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভেদাভেদ ভুলে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে নির্দেশনা দেন। এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রার্থী হিসেবে রয়েছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপি, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-প্রশিক্ষণ সম্পাদক রেহানা আক্তার রানু, সদস্য মশিউর রহমান বিপ্লব, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার, সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল, যুগ্ম-আহ্বায়ক এমএ খালেক, গাজী হাবিব উল্যাহ মানিক ও আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী। তাদের অনেকেই আগামী নির্বাচনের জন্য নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করে রেখেছেন।

অপরদিকে বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভ‚ঁঞা। প্রবীণ এ রাজনীতিকের প্রচারণায় অংশ নেয়ার পর দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গা ভাব বিরাজ করছে।

এ আসনে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জুকে নিয়ে আলোচনা চলছে। বিএনপি-এবি জোট গঠিত হলে মঞ্জুকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার কৌশলও বিবেচনা করা হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। 

এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জেলা সেক্রেটারি মাওলানা একরামুল হক ভূইয়া, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (মামুনুল হক) কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা হারুনুর রশিদ ভূইয়া ও খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সলকে দলীয় একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী) আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে বিভিন্ন প্রার্থীরা। এখানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অনেকেই। 

এছাড়া দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে কেন্দ্রীয় মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহানা আক্তার শানু, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ জনি, দাগনভূঞা উপজেলা আহ্বায়ক আকবর হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে।

আসনটিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ডা. ফখরুদ্দিন মানিক দলীয় একক প্রার্থী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। 

এছাড়া জেএসডির (রব) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, ইসলামী আন্দোলনের চট্টগ্রাম মহানগরের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক সাইফুদ্দিন শিপন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (মামুনুল হক) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা এনামুল হক মুসা, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা মোহাম্মদ আলী মিল্লাতকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল জানান, “দল থেকে যাকেই প্রার্থী দেওয়া হবে, তার জন্য তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব।”

জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মুফতি আবদুল হান্নান বলেন, “ফেনীর তিনটি আসনেই আমরা এককভাবে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী ঘোষণা করেছি। আশা করি এবারের নির্বাচনে ভোটাররা সৎ, যোগ্য ও ইসলামের পক্ষে রায় দেবেন।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ফেনী জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন জানান, “জুলাই বিপ্লবের পর মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সাধারণ মানুষ যেন ভোট দিয়ে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন, সেই পরিবেশ সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।”

ইএইচ