মতলবে ১৬ বছরের হাসপাতালে ১৪ বছরই সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ

মতলব (চাঁদপুর) প্রতিনিধি প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০২৫, ০৫:০৬ পিএম

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটারটি যেনো সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসছে না। গাইনি চিকিৎসকের অভাবে ১৬ বছরের এই সরকারি হাসপাতালে ১৪ বছরই সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে।

মতলব উত্তর উপজেলার ৩১ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালটি ৫০ শয্যার সকল অবকাঠামো সম্পন্ন হওয়ার দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখনো কার্যক্রম চালু হয়নি। তবে অপারেশন থিয়েটারটি পুরনো ভবন থেকে নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে, এটুকুই।

চরাঞ্চল সমৃদ্ধ গ্রামীণ এই উপজেলার অসংখ্য অসচেতন প্রসূতি মায়েরা যেখানে বাচ্চা প্রসবের বিষয়ে দাই (ধাত্রী)-এর উপর নির্ভরশীল, সেখানে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬ বছরের এই সরকারি হাসপাতালে ১৪ বছরই গাইনি চিকিৎসক ও এনেস্থেশিয়া না থাকার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী।

উপজেলার ৫ লক্ষাধিক জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দিতে ২০০৮ সালে উপজেলার মরাদোন এলাকায় নির্মিত হয় ৩১ শয্যা বিশিষ্ট মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন গাইনি চিকিৎসক থাকলেও তিনি ডেপুটেশনে চলে গেছেন অন্যত্র।

স্থানীয় ছেংগারচর বাজারে সিজারিয়ান অপারেশন হয় এমন একটি ক্লিনিকের পরিচালকের সঙ্গে কথা হলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “উপজেলা হাসপাতালের গাইনি ডা. তাছলিমা আফরোজ গ্রামীণ এই উপজেলায় থাকবেন না, এটাই স্বাভাবিক। কারণ তিনি এফসিপিএস করেছেন। এখানকার স্থানীয় কোনো প্রাইভেট ক্লিনিকে পর্যাপ্ত সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা নেই। থাকলে তিনি মোটা অংকের উপার্জন করতে পারতেন। যেহেতু এখানে সেই ব্যবস্থা নেই, কাজেই ডাক্তারের গ্রামীণ উপজেলায় থাকা সম্ভব হয় না। চাকরির পাশাপাশি অধিক উপার্জনের জন্য তিনি ব্যস্ততম এলাকায় থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক।”

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, এখানে নেই—জুনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি, জুনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি, জুনিয়র কনসালটেন্ট এনেস্থেশিয়া, জুনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, জুনিয়র কনসালটেন্ট শিশু ও একজন মেডিক্যাল অফিসার। এছাড়াও এখানে নিয়োগ থাকলেও দুইজন মেডিক্যাল অফিসার (ডা. সাবিয়া জাহান ও ডা. কামরুজ্জামান শিশির) ডেপুটেশন নিয়ে চলে গেছেন নারায়ণগঞ্জ সদরের খাঁনপুর হাসপাতালে।

তবে এই হাসপাতালে কখনো গাইনি চিকিৎসক থাকলেও এনেস্থেশিয়া চিকিৎসক কখনো থাকেন না, সার্জনও অনুপস্থিত থাকেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গেইটের কাছের এক ফার্মেসির স্টাফ জানান, “মানুষ না জানার কারণে অনেক সময় প্রসূতি মায়েরা (সিজার/নরমাল) ডেলিভারির জন্য এই হাসপাতালে নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রসূতি মা’দেরকে আবার অন্যত্র ছুটে যেতে হয়। স্থানীয় রাস্তা-ঘাট ভাঙাচোরা, তার ওপর প্রসূতি মা’দের নিয়ে ছুটোছুটি—এইসবের কারণে রোগীর সঙ্গে আসা লোকজন মারাত্মক বিরক্তি প্রকাশ করে, কখনো কখনো গালমন্দ করতে করতে ফিরে যেতে দেখা যায়।”

উপজেলার লামছরি এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ইলিয়াছ আলী বলেন, “আমার বইনের (বোন) বাচ্চা হবে। যন্ত্রণায় বইনে ছটফট শুরু করলে আমরা অনেক কষ্ট করে তাকে উপজেলা সরকারী এই বড় হাসপাতালে আনলে স্যারেরা বলেন—‘আমার বইনের কোনো ব্যবস্থা নেই, আপনাদের অন্য হাসপাতালে যেতে হবে’। পরে ছেংগারচর বাজারের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে অপারেশন করাই।”

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটার ব্যবহার না হওয়ার বিষয়ে ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, “এখানে অপারেশন বন্ধ রয়েছে, এটি সত্য। একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি ছিলেন, পরে ডেপুটেশনে চলে যাওয়ায় আমরা দীর্ঘদিন বিপাকে আছি। আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। আশা করি একজন গাইনি চিকিৎসক সরকার আমাদের দেবে।”

ইএইচ