রাজশাহীর তানোরে অরক্ষিত একটি নলকূপের গর্ত কেড়ে নিল পাঁচ বছরের শিশু সাজিদ হোসেনের প্রাণ। দীর্ঘ প্রায় ৩২ ঘণ্টার উদ্বেগ উৎকণ্ঠার উদ্ধার অভিযানের পর বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
পরে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বরত জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, শিশুকে উদ্ধারের জন্য টানা চেষ্টা চালানো হলেও গর্তের গভীরতা ও সংকীর্ণতা অভিযানকে কঠিন করে তোলে। “জীবিত বা মৃত যে অবস্থাতেই হোক, সাজিদকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত আমরা অভিযান চালিয়ে যাব, বিকেলে এমন মন্তব্য করেছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশার আলো নিভে যায়।
এর আগে, বুধবার দুপুরে উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট গ্রামে ঘটে এ দুর্ঘটনা। সাজিদ তার মা ও ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ির পাশের জমি পার হচ্ছিল। জমিটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা খড় দিয়ে ঢাকা ছিল। খড়ের নিচে রয়েছে একটি গভীর নলকূপের পরিত্যক্ত গর্ত এ কথা মা জানতেন না। হাঁটার সময় হঠাৎ খড় ভেঙে শিশুটি নিচে পড়ে যায়। এরপরই পেছন থেকে ভেসে আসে আতঙ্কিত এক চিৎকার—মা মা!
মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারেন শিশুটি আর সঙ্গে নেই। দ্রুত খড় সরাতেই বেরিয়ে আসে অরক্ষিত, খোলা মুখের গভীর পাইপ—স্থানীয়দের ভাষায় একটি ‘মৃত্যুকূপ’।
স্থানীয়রা জানান, গত বছর এলাকার এক ব্যক্তি গভীর নলকূপ খনন করতে গিয়ে প্রায় ১২০ ফুট নামার পরও পানি না পেয়ে কাজ বন্ধ করেন। কিন্তু পাইপটি মুখ খোলা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। বর্ষায় মুখ আরও প্রশস্ত হয়, আর কেউ এটিকে ঢেকে রাখা বা সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
দুর্ঘটনার পর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শোকের ছায়া। মুহূর্তেই ভিড় জমে হাজারো মানুষের। গর্তের পাশে বসে নির্ঘুম রাত কাটান সাজিদের মা। কখনো দোয়া, কখনো কান্না এভাবেই কাটে তার দীর্ঘ রাত।
উদ্ধারকর্মীরা গর্তের মধ্যে অক্সিজেন পাঠাতে থাকেন, যাতে ভেতরে কোনো সম্ভাব্য জীবনচিহ্ন থাকলে তাকে ধরে রাখা যায়। প্রথমদিকে সামান্য শব্দ শোনা গেলেও সময় বাড়ার সাথে সাথে সেই আশাব্যঞ্জক শব্দ থেমে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও একটি মেডিকেল টিম ঘটনাস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান নেয়। সংকীর্ণ ও গভীর গর্তে পৌঁছানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে মাটি কেটে সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে উদ্ধারকারীরা শিশুটিকে উপরে তুলতে সক্ষম হন। ততক্ষণে সবার মুখে একই শঙ্কা শিশুটি আর বেঁচে নেই। কয়েক মিনিট পরই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক নিশ্চিত করেন দুঃসংবাদ সাজিদ আর নেই।
চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আনার আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। গর্তের গভীরতা, বাতাসের অভাব ও সময়ক্ষেপণ সব মিলিয়ে বাঁচার সম্ভাবনা ছিল অতি ক্ষীণ।
সাজিদের মৃত্যুতে গোটা কোয়েলহাট গ্রাম যেন স্তব্ধ। বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী সবাই বাকরুদ্ধ। যে গর্তটি বছরের পর বছর পড়ে ছিল অবহেলায়, সেটিই কেড়ে নিল একটি শিশুর জীবন।
এখন স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন এ রকম পরিত্যক্ত গর্ত কত আছে আমাদের গ্রামে? আর কত শিশুর জীবন ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত নলকূপ বা গভীর গর্ত অরক্ষিত থাকার ঘটনা নতুন নয়। যথাযথ নজরদারি, সচেতনতা ও আইন প্রয়োগের অভাবেই অসংখ্য অরক্ষিত গর্ত মরণফাঁদ হয়ে আছে। স্থানীয় প্রশাসন চাইলে এমন দুর্ঘটনা আগেই ঠেকানো সম্ভব ছিল।
সাজিদের মৃত্যু তাই কেবল একটি পরিবারের নয় সামাজিক অবহেলাজনিত এক নির্মম পরিণতি।
ইএইচ