সারা বাংলাদেশ ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হলেও নীলফামারী জেলার গুরুত্বপূর্ণ শহর সৈয়দপুর শত্রুমুক্ত হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে ভারতের হিম কুমারী ক্যাম্প থেকে আসা মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ দল সৈয়দপুর শহরে প্রবেশ করে এবং শহরটিকে দখলমুক্ত করে। বিজয়ের এই আনন্দ ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আছড়ে পড়ে আনন্দ মিছিল বের করেন।
মুক্তির এই দিনে আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম কাজী ওমর আলীর নেতৃত্বে শহরে একটি বিশাল বিজয় মিছিল বের করা হয়। সে সময় নেতৃবৃন্দ প্রথম সৈয়দপুর পৌরসভা ও আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
সৈয়দপুরের মুক্তিকামী মানুষের প্রস্তুতির শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই। তবে সৈয়দপুর শহরটি অবাঙালি অধ্যুষিত হওয়ায় এখানকার পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। ২৩ মার্চ রাতে লিবার্টি সিনেমা হলের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়। সেই সময় বিহারীদের গুলিতে আলোকদিহি ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান মাহাতাব বেগ শহীদ হন, যাকে সৈয়দপুরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাপ সৈয়দপুর সেনানিবাসেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ২৪ মার্চ ভোরে সেনানিবাসে অবস্থানরত ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি ও পাঞ্জাবি সৈন্যদের মধ্যে মরণপণ যুদ্ধ শুরু হয়। সীমিত অস্ত্র নিয়ে বাঙালি সৈন্যরা বীরত্বের সাথে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হন। এরপর থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা শহরে ব্যাপক বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করে। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলা ভয়াবহ সহিংসতায় প্রায় ১০০ জন বাঙালি প্রাণ হারান। এরপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্দেশে সৈয়দপুর হাইস্কুল ও দারুল উলুম মাদ্রাসায় দুটি বন্দিশিবির তৈরি করে প্রায় ৭০০ বাঙালি পরিবারকে সেখানে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।
সৈয়দপুরের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়টি রচিত হয় ১৩ জুন, যা ‘গোলাহাট গণহত্যা’ নামে পরিচিত। এদিন ভারতে পৌঁছে দেওয়ার নাম করে হিন্দু ও মারওয়ারী সম্প্রদায়ের মানুষকে ট্রেনে তোলা হয়। কিন্তু ট্রেনটি শহরের উপকণ্ঠে ফাঁকা জায়গায় থামিয়ে ৩৩৮ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এর আগে ১২ এপ্রিল ডা. জিকরুল হক ও ডা. এস এম ইয়াকুবসহ ১৫০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে রংপুর সেনানিবাসের পাশে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে ১৮ ডিসেম্বর যখন যৌথবাহিনী সৈয়দপুর শহরে প্রবেশ করে, তখনও ডা. মোবারক আলীর মতো নিবেদিত প্রাণ নেতাদের প্রাণ দিতে হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধে পুরো সৈয়দপুর উপজেলায় অন্তত ৬৫০ জন মানুষ শাহাদাত বরণ করেছেন।
জেএইচআর