‘দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশে, রেমিটেন্স দিয়ে গর্বিত স্বদেশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রংপুরে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস এবং জাতীয় প্রবাসী দিবস ২০২৫ পালিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে দশটায় শিল্পকলা একাডেমির অডিটোরিয়াম হলরুমে রংপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর জেলা প্রশাসক মো. এনামুল আহসান। সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন রমিজ আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)।
এ সময় প্রধান অতিথি বলেন, রংপুরের একটি ছেলে যখন একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সে যখন বিজয়ী হয় আমি তখন খুশি হই। রংপুর জেলার একজন অভাবী মানুষ যখন কষ্টে তার দিনাতিপাত করে তখন আমি ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পাই। কাজেই আমার চিন্তা, আমার সময়, আমার যে কাজ সবই কিন্তু আপনাদের জন্য এবং আমি আপনাদের সামনে এখানে দাঁড়িয়ে কথা নিশ্চিতভাবেই বলছি যে আমাদের যে কোন কাজ আমরা রংপুর জেলার জন্য আরো বেশি সুন্দর ভাবে আরো বেশি বেগবান ভাবে আমরা করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, আমরা ব্যবহার করতে পারছি না আমাদের এখানে অনেক ভালো দক্ষ যুবক এবং যুবতী রয়েছে যারা প্রকৃত দরজাটি খুঁজে পাচ্ছে না। এই দরজাটি বের করে দেয়ার জন্য চ্যানেল লাইভ করার জন্য আমাদের আজকের এই আয়োজন। আমাদের এই আয়োজনে আজকে আলোচনা সভা হচ্ছে এর মাধ্যমে আপনারা জানতে পারছেন বাংলাদেশের নাগরিকদের বিশ্বের কোন কোন জায়গায় কি কি সুযোগ রয়েছে। তা বোঝানোর জন্য কাউন্সিলর রয়েছে। তাহলে আপনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। একই সাথে আপনাদের অভিবাসনটি হতে হবে নিরাপদ। আমরা দেখতে পাই কিছুদিন আগে বাংলাদেশের মানুষ পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছেন। আমরা দালালদের কাছ থেকে সতর্ক থাকব। আমার প্রথমে দরকার হচ্ছে আমার দক্ষতা। আমরা আট ঘণ্টা কাজ করে যে বেতন পাই আমার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তার চেয়ে দ্বিগুণ অথবা তিন গুণ পায় বিদেশে। এর একটি মাত্র কারণ হচ্ছে আমাদের আসলে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব। তো কাজেই এই দক্ষতা ডেভলপ করার জন্য কিন্তু আমাদের এই রংপুর জেলাতে টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটসহ আরো অন্যান্য ইনস্টিটিউট রয়েছে। এই ইনস্টিটিউটগুলো থেকে যদি আপনারা কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ভাষার প্রশিক্ষণটি গ্রহণ করে যদি বিদেশে যান তাহলে কিন্তু আপনার বেতন যেখানে হবে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেটা এক লক্ষ টাকা হয়ে যাবে। পরিবার থেকে কিছুদিন একটু একটা ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে যদি আপনি এই যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণগুলো যদি গ্রহণ করেন এবং সে প্রশিক্ষণ নিয়ে যদি আপনি দেশের বাইরে যান তাহলে কিন্তু আপনার বেতন অনেক বেশি পাবেন।
এ সময় বক্তারা বলেন, বিশ্বের ১৭৬টি দেশে এখন প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। তাদের পরিশ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। তাদের নিদারুণ পরিশ্রমে আজ দেশের অর্থনীতি পেয়েছে এক ভিন্ন চেহারা। তারপরও বিদেশগামী কর্মীরা প্রতারণার হাত থেকে নিস্কৃতি বা সঠিক বিচার পাচ্ছেন না। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চেষ্টা সত্ত্বেও অভিবাসন খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এই সেক্টরটি স্বার্থান্বেষী নানা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে, সরকারি উদ্যোগগুলো যেন ‘অসহায়’। এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এই দিবসটি ঘটা করে পালন করলেও প্রবাসীরা আজও তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। তাই কত বেশি কর্মী পাঠিয়ে কত বেশি রেমিট্যান্স আনা যায় সরকারের সেদিকে নজর থাকলেও প্রবাসী কর্মীদের মানোন্নয়ন ও অধিকার রক্ষায় উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নেই। এখনো অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আমাদের কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর সময় অন্যায়ভাবে কয়েক গুণ বেশি টাকা রাখা হয়। প্রতিটি গন্তব্যের জন্য অভিবাসন খরচ সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে তা কেউ মানে না। এই অন্যায় দেখারও কেউ নেই।
প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান ও সুরক্ষা দিতে ২৭টি দেশে ৩০টি শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্যও নীতিমালা ও প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রবাসীদের অভিযোগ বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে শ্রমকল্যাণ উইং থেকে কার্যকর তেমন সেবা তারা পান না। কোনো সেবা নিতে গেলে দূতাবাসের একশ্রেণির কর্মচারী নানাভাবে হয়রানি করেন। সেবা দিতে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করেন। অনেক সময় প্রবাসী কর্মীদের দূতাবাসের ধারেকাছেই আসতে দেওয়া হয় না। প্রবাসীদের আশানুরূপ সেবা না পাওয়ার কারণ হিসেবে দূতাবাসের পক্ষ থেকে বারবার জনবল ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়। আবার প্রবাসীদের সেবা দিতে শ্রমকল্যাণ উইংগুলোতে দালাল সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগও নতুন নয়। তারা দূতাবাসে সেবা নিতে আসা প্রবাসীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন এবং এ জন্য নানাভাবে হয়রানি করে থাকেন।
এদিকে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের একটি অংশ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করেছেন। তাদের মতে সরকারের ব্যর্থতায় গত এক বছরের বেশি সময়ে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি তো হয়নি বরং পুরোনো বন্ধ হওয়া শ্রমবাজারগুলোও খুলতে পারেনি। বারবার আশ্বাস দিয়েও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান আজও চালু করতে পারেনি সরকার। এমনকি এই বাজারগুলোর আগে বন্ধ হওয়া ৯টি শ্রমবাজারের একটিও এ পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে প্রতিনিয়তই কমছে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার। এতে জনশক্তি রপ্তানি খাতে ধস নামার আশঙ্কা দেখছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা করে নতুন বাজার চালু এবং পুরোনো বাজার খুলতে না পারলে যেকোনো সময় ক্ষতির মুখে পড়বে খাতটি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও দেখা দিচ্ছে নানা সংকট। প্রতিবছর মোট জনশক্তি রপ্তানির ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কর্মী সৌদি আরবে যান। চলতি বছরেও এ পর্যন্ত যে ১০ লক্ষ ৭১ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন এবং এর মধ্যে ৭ লক্ষ ১২ হাজার গেছেন সৌদি আরবে। সৌদি আরবে এখনো সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মী যান। সেখানকার বাজারেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নতুন আইনে সৌদি আরবে কাজ করতে গেলে কর্মীদের দেশটির যাওয়ার পর ইকামা, চাকরি, বেতনসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সৌদি আরবে যাওয়ার পর এসব জটিলতায় কয়েক মাস বেকার বসে কাটাতে হয় কর্মীদের।
সভা শেষে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতিবন্ধী আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে চেক বিতরণ করা হয়।
ইএইচ