বাড়ির সামনেই যুবদল নেতাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করল মুখোশধারীরা

রাউজান (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২৬, ১১:১৬ পিএম

চট্টগ্রামের রাউজানে রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলো আরও একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। 

সোমবার রাতে বাড়ির অদূরেই টার্গেট কিলিং এর শিকার হয়েছেন উপজেলা যুবদলের প্রভাবশালী নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার (৪৮)। মোটরসাইকেলে করে আসা তিন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে বুক ও শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। 

পুলিশের তদন্ত কেন্দ্রের মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যে সংঘটিত এই ভয়াবহ হামলায় পুরো উপজেলা জুড়ে নতুন করে চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

নিহত জানে আলম সিকদার রাউজান উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের সিকদার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি উপজেলা যুবদলের সক্রিয় সদস্য এবং ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। 

দলীয় রাজনীতির সমীকরণে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে জানে আলম স্থানীয় অলিমিয়াহাট বাজার থেকে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন। বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরত্বে পৌঁছালে একটি মোটরসাইকেলে করে তিন যুবক তার গতিরোধ করে। খুনিরা সবাই মুখোশ পরিহিত ছিল। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়া হয়। গুলির শব্দে আশপাশের মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগেই ঘাতকরা মোটরসাইকেল চালিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। ঘটনার সময় রাস্তার পাশে থাকা পথচারীরা উপস্থিত ছিলেন,।

রক্তাক্ত অবস্থায় জানে আলমকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয়রা রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে চট্টগ্রাম মহানগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের স্থানটি পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এত কাছে এমন দুঃসাহসিক অপারেশন জনমনে নিরাপত্তার প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।

খবর পাওয়ার পরপরই পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক দিপ্তেষ দাশের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং আলামত সংগ্রহ করে। পুলিশ জানায়, খুনিদের শনাক্ত করতে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের বিশ্লেষণ চলছে।

গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাউজানে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবতারণা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ মাসে রাউজানে মোট ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ১২টিই সরাসরি রাজনৈতিক কারণে।

 সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের জেরে। বাকি ৫ জন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাউজানে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শতাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে, যাতে এ পর্যন্ত ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সোমবারের এই হত্যাকাণ্ডও সেই দীর্ঘদিনের রেষারেষির অংশ কি না, তা নিয়ে খোদ বিএনপি নেতাদের মধ্যেই গুঞ্জন চলছে। 

উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমদ এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। 

তিনি বলেন, জানে আলম আমাদের দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। এভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যার ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও অস্ত্রধারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।

রাউজানে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং টার্গেট কিলিং এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। জানে আলম সিকদারের হত্যাকাণ্ড আবারও প্রমাণ করল যে, এখানে রাজনীতির মাঠ এখনো রক্তের নেশায় মত্ত। সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল তদন্তের আশ্বাস নয়, বরং রাউজানকে মৃত্যু উপত্যকা থেকে রক্ষায় প্রশাসনকে অবিলম্বে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

অন্যথায়, একের পর এক লাশের পাহাড় রাউজানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের সময় পুলিশের সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।