পরিবেশ ধ্বংসের সবচেয়ে বড় হটস্পটে পরিণত হয়েছে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা। জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, উপজেলাটিতে ৩৩টিরও বেশি অবৈধ ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে। লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, নির্ধারিত চিমনি কিংবা ফিটনেস কোনোটিই না থাকলেও বছরের পর বছর ধরে এসব ভাটায় নির্বিঘ্নে ইট উৎপাদন চলছে।
গত মাসে প্রশাসনের অভিযানে জেলার তিনটি অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সর্বশেষ গতকাল সদর উপজেলার ১১টি ভাটায় ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। তবে মোহাম্মদপুর উপজেলার অধিকাংশ অবৈধ ভাটায় কার্যত কোনো প্রভাব পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মাগুরা জেলায় মোট ইটভাটার সংখ্যা ১০২টি। এর মধ্যে আইন অনুযায়ী বৈধ মাত্র ৩টি। বাকি ৯৯টি ভাটাই সম্পূর্ণ অবৈধ, যার একটি বড় অংশ মোহাম্মদপুর উপজেলায় অবস্থিত।
আইন অনুযায়ী ইটভাটা পরিচালনার জন্য লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, নির্ধারিত চিমনি ও ফিটনেস বাধ্যতামূলক। বাস্তবে মোহাম্মদপুরের অধিকাংশ ভাটারই এসবের কোনোটি নেই।
গত মাসে খুলনা বিভাগীয় প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে মাগুরা শহর ও আশপাশের এলাকায় ৩টি অবৈধ ইটভাটা সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া হয়। সে সময় প্রশাসন জানায়, পর্যায়ক্রমে জেলার সব অবৈধ ভাটা বন্ধ করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অভিযানের পরও মোহাম্মদপুর উপজেলার ৩৩টির বেশি অবৈধ ভাটা আগের মতোই চালু রয়েছে।
গত ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে সদর উপজেলার ১১টি অবৈধ ইটভাটায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মোট ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। মোবাইল কোর্টে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম ও মো. রাফাত আল মেহেদী। প্রসিকিউটর ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তর মাগুরার সহকারী পরিচালক শোয়াইব মোহাম্মদ শোয়েব।
অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ একাধিক সংস্থা অংশ নেয়। তবে এই অভিযানের পরও মোহাম্মদপুরে কোনো ভাটা ভাঙা না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে জরিমানা কি তবে অবৈধ ভাটা চালুর অলিখিত লাইসেন্সে পরিণত হচ্ছে?
মোহাম্মদপুর উপজেলার স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটার ট্রাক ও ট্রলি ৩–৪ গুণ অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চলাচল করায় গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট, স্কুল, কলেজ ও মসজিদে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মতিন বিশ্বাস বলেন, "ভাটা ভাঙার খবর পত্রিকায় দেখি, কিন্তু আমাদের উপজেলায় কিছুই হয় না। তাহলে কি মোহাম্মদপুর আলাদা আইন পায়?"
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর জারি করা এক স্মারকে স্পষ্টভাবে বলা হয়, লাইসেন্সবিহীন কোনো ইটভাটা চালু রাখা যাবে না।
ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাদের অবৈধ ভাটা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ভাটা রাতের আঁধারে কিংবা প্রকাশ্যেই চলছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর মাগুরার সহকারী পরিচালক শোয়াইব মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, "মোহাম্মদপুরসহ পুরো জেলায় অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা খুব বেশি। এগুলো পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ভবিষ্যতে জরিমানার পাশাপাশি ভাটা ভেঙে দেওয়া হবে, লাইসেন্সহীন ভাটার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে এবং অবৈধ মাটি কাটা ও পরিবহন বন্ধে মোবাইল কোর্ট জোরদার করা হবে।
মাগুরা জেলা ও মোহাম্মদপুর উপজেলার সাধারণ মানুষের দাবি, ৩৩টির বেশি অবৈধ ইটভাটা দ্রুত বন্ধ ও ভেঙে দিতে হবে। সব উপজেলায় সমান আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করে জরিমানার পরিবর্তে স্থায়ী সমাধান করতে হবে। ১০২টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র ৩টি বৈধ এই ভয়াবহ চিত্র বদলাতে হলে এখন আর খণ্ডিত অভিযান নয়, সব অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধেই একযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই সময়ের দাবি।
ইএইচ