মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির মধ্যকার তুমুল যুদ্ধের বলি হচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ। ওপার থেকে আসা প্রাণঘাতী অস্ত্রের আঘাতে একদিনের ব্যবধানে দুই বাংলাদেশি নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন। সোমবার সকালে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে এক ব্যক্তির পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অন্যদিকে, আগের দিন গুলিতে মাথায় আঘাত পাওয়া ৯ বছরের শিশু হুজাইফা এখনো সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে।
সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের বিলাইস্যার দ্বীপ এলাকায় এক ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হানিফ কাজ উপলক্ষে সীমান্তের কাছাকাছি গেলে সেখানে আগে থেকে পুঁতে রাখা একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় মুহূর্তেই হানিফের একটি পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে উখিয়ার কুতুপালংয়ে অবস্থিত এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। স্থানীয়দের ধারণা, মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বা নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিতে সীমান্তের শূন্যরেখায় এই মাইনগুলো পুঁতে রেখেছে।
এদিকে, গত রোববার সকালে মিয়ানমার থেকে আসা গুলিতে আহত টেকনাফের শিশু হুজাইফা আফনানের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে থাকা শিশুটির জ্ঞান গত ২৪ ঘণ্টায়ও ফেরেনি। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন জানিয়েছেন, রবিবার রাতে হুজাইফার মাথায় একটি জটিল অস্ত্রোপচার করা হলেও তার মস্তিষ্কের ভেতর থেকে গুলিটি বের করা সম্ভব হয়নি। গুলিটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থানে থাকায় তা বের করা বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
সীমান্তে একের পর এক বাংলাদেশি নাগরিক হতাহতের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার সকালে হোয়াইক্যংয়ের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় কয়েকশ স্থানীয় মানুষ একত্রিত হয়ে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা মিয়ানমার থেকে আসা গোলাগুলি ও সীমান্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তারা বলেন, আমরা নিজেদের জমিতেও এখন নিরাপদ নই। ওপার থেকে আসা গুলি আর মাইনের ভয়ে আমাদের জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপ এলাকায় জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়েছে। সীমান্তের ওপারে বিকট বিস্ফোরণের শব্দে টেকনাফের এপারের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছে। ওপার থেকে আসা লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেট ও মর্টার শেল নিয়মিত এপারের ফসলি জমি ও নাফ নদীতে এসে পড়ছে। বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন সীমান্তবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিলেও আতঙ্কে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের আগুনের আঁচে দগ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্ত। হুজাইফার শৈশব আর হানিফের সচল জীবন এখন হাসপাতালের চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। সীমান্তের এই মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।
এএন