ছয় মাসের ব্যবধানে একই ভবন থেকে ৫টি মরদেহ উদ্ধার, এলাকাজুড়ে আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিনিধি, সাভার প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৮, ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
সংগৃহীত ছবি

সাভারের থানা রোডে অবস্থিত পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে একই ভবন থেকে পঞ্চমবারের মতো মানুষের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। 

রোববার দুপুরে ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে অজ্ঞাত পরিচয় আরও দুই ব্যক্তির ঝলসে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো সাভার পৌর এলাকাজুড়ে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার দুপুরে পরিত্যক্ত ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পোড়া মরদেহের অস্তিত্ব টের পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে সাভার মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মরদেহ দুটি এমনভাবে পোড়ানো হয়েছে যে দেখে চেনার কোনো উপায় নেই। ধারণা করা হচ্ছে, অপরাধীরা হত্যার পর পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যেই মরদেহের ওপর দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

সাভার মডেল থানার পাশাপাশি ঘটনার রহস্য উন্মোচনে কাজ শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই-এর ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের চারপাশ থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। অধিকতর তদন্ত এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের জন্য মরদেহ দুটি ঢাকার মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সামনে অবস্থিত এই বিশাল ভবনটি একসময় আনন্দ-উৎসবের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সংঘর্ষের সময় ভবনটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরপর থেকেই এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

অরক্ষিত প্রবেশপথ: ভবনটির জানালা-দরজা না থাকায় এবং কোনো সীমানা প্রাচীর বা নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় এটি মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।

আঁধার ও নিস্তব্ধতা: বিদ্যুৎ সংযোগহীন এই ভুতুড়ে ভবনটি রাতের বেলা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে থাকে, যা অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আস্তানা হিসেবে কাজ করে।

অবস্থান: থানা রোডের মতো ব্যস্ত এলাকায় থাকা সত্ত্বেও ভবনের ভেতরের অংশ লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় এখানে অপরাধ করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

আজকের দুই জনসহ গত ছয় মাসে এই একই ভবন থেকে মোট ৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বারবার একই স্থানে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের নাকের ডগায় একটি ভবনে একের পর এক মানুষ খুন করে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, অথচ অপরাধীদের ধরা তো দূরের কথা, ভবনের প্রবেশপথ পর্যন্ত বন্ধ করা হয়নি। আমরা এখন এই রাস্তা দিয়ে চলতে ভয় পাই।

এর আগে উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহের পরিচয় যেমন এখনও স্পষ্ট হয়নি, তেমনি সেই হত্যাকাণ্ডগুলোর রহস্যও উদঘাটিত হয়নি। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিনুর কবির জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে এই পরিত্যক্ত ভবন ও এর আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছি। পিবিআই এবং ডিবি পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত করছে। অপরাধী চক্রটি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, এই চক্রটি মৃতদেহ দূর-দূরান্ত থেকে এখানে এনে আলামত নষ্ট করার জন্য পুড়িয়ে দিচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এএন