সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত পার্টনার-ডিএএম প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশের পর সাংবাদিক মিরাজ আহমেদের বিরুদ্ধে মামলার হুমকির ঘটনায় মাগুরা জেলায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ‘বাবুল মাশরুম’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া হুমকিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন মহলে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অনেকের প্রশ্ন, দুর্নীতির খবর প্রকাশ করাই যদি মামলার হুমকির কারণ হয়, তবে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোথায়।
মাগুরা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্বই হলো অনিয়ম তুলে ধরা। প্রকল্পে অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামলা করার হুমকি স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী এবং নিন্দনীয়।
বিশ্বব্যাংক ও সরকারের অর্থায়নে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন পার্টনার-ডিএএম প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ১২ দিনব্যাপী ‘অন দ্য জব’ প্রশিক্ষণ। প্রকল্প নীতিমালা অনুযায়ী এ প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হওয়ার কথা। অথচ মাগুরায় প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
প্রশিক্ষণার্থীদের ভাষ্য, সরকারি বরাদ্দে পিকনিক আয়োজনের কথা থাকলেও তাদের কাছ থেকেই অর্থ নেওয়া হয়েছে, যা প্রকল্প নির্দেশিকার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এ ছাড়া নির্ধারিত প্রশিক্ষক ছাড়া ক্লাস নেওয়া, আবাসিক প্রশিক্ষণের নামে বাড়ি থেকে যাতায়াত করেও সরকারি বিল উত্তোলন, উদ্বোধনী ও পরিদর্শন কর্মকর্তারা মাঠে না এলেও প্রশিক্ষকের বিল উত্তোলনের মতো অভিযোগ সামনে এসেছে। খাবার ও উপকরণ সরবরাহেও ব্যাপক অনিয়মের কথা জানিয়েছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। প্রকল্প অনুযায়ী মাগুরা জেলায় ৪০০ জন প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে নেওয়া হচ্ছে ৩০০ জন। শালিখা উপজেলা ধারাবাহিকভাবে বাদ পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১২ দিনের প্রশিক্ষণ ১১ দিনেই শেষ করে সমাপনী অনুষ্ঠান করার অভিযোগও উঠেছে। জেলা বাবদ প্রকৃত বরাদ্দের তথ্য জানাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনীহা এ প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করেছে।
ড্রিম মাশরুম ভ্যালির মালিক বাবুল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছি। প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন খাতে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার বিল হয়েছে, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী উত্তোলন করেছি।”
প্রশিক্ষক হিসেবে তার অনুমোদন সংক্রান্ত নথি দেখাতে না পারার বিষয়ে তিনি বলেন, “প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আমার অভিজ্ঞতার কারণেই আমাকে যুক্ত করা হয়েছে।”
তবে প্রকল্পের অনুমোদিত প্রশিক্ষকের তালিকায় তার নাম আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো লিখিত কাগজ দেখাতে পারেননি।
মাগুরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, “প্রশিক্ষণ যেভাবে হওয়ার কথা, বাস্তবে সব জায়গায় শতভাগ মানা যাচ্ছে না। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। মান নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছে।”
বরাদ্দ ও উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “উপর থেকে যেভাবে নির্দেশনা আসে, সেভাবেই আমাদের কাজ করতে হয়।” তবে জেলা বাবদ প্রকৃত বরাদ্দ কত, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট তথ্য দিতে রাজি হননি।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নাসির-উদ-দৌলা জানান, অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-ফারুক বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে। সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলামও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দেন।
এদিকে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশের পর সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় মাগুরা জুড়ে প্রশ্ন উঠেছে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে। সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি হুমকিদাতাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ইএইচ