ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাবনা-৫ (সদর) আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ এখন রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র ও রাজনৈতিক সহযোগী বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে প্রকাশ্য সংঘাত।
মঙ্গলবার দুপুরে পাবনা সদরের হিমাইতপুর ইউনিয়নের বুদের হাট এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার শুরু আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হোসাইনের সমর্থনে প্রায় ৫০ জন নারী কর্মী বুদের হাট এলাকায় ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। ঠিক একই সময়ে বিএনপি প্রার্থী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সমর্থকরাও ওই এলাকায় নির্বাচনী জনসংযোগে নামেন।
উভয় পক্ষ একই এলাকায় অবস্থান করায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। প্রথমে ভোট চাওয়া নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হলেও দ্রুতই তা হট্টগোল ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়। স্থানীয়রা জানান, দুই দলের কর্মীদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন।
জামায়াতের প্রার্থী ইকবাল হোসাইন এই ঘটনার জন্য সরাসরি বিএনপি কর্মীদের দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ:
* তাঁদের নারী কর্মীরা যখন শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের লিফলেট বিতরণ করছিলেন, তখন বিএনপির একদল কর্মী তাঁদের ওপর চড়াও হয়।
* নারী কর্মীদের গালিগালাজ করার পাশাপাশি তাঁদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে।
* বাধা দিতে গেলে দলের বয়োজ্যেষ্ঠ নারী নেত্রীদের ওপরও হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
জামায়াত প্রার্থীর পক্ষ থেকে একে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা প্রদানের একটি অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট দাবি করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক ও শিমুল বিশ্বাসের নির্বাচন সমন্বয়কারী জহুরুল ইসলাম ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, জামায়াতের নারী কর্মীরা প্রচারণার আড়ালে সাধারণ গৃহবধূদের কাছ থেকে কৌশলে ভোটার আইডি নম্বর এবং বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছিলেন।
ভোটের বিনিময়ে প্রলোভন বা নগদ অর্থের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছিল, যা দেখে এলাকাবাসী এবং সাধারণ ভোটাররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
স্থানীয় জনগণ যখন এই অনৈতিক কাজের কারণ জানতে চায়, তখন জামায়াত কর্মীরা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য গোলমাল শুরু করেন।
জহুরুল ইসলামের অভিযোগ, জামায়াত এলাকায় ‘সশস্ত্র ক্যাডার’ পাঠিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। বিএনপির কর্মীরা সহনশীল ছিল বলেই বড় ধরনের রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
হট্টগোলের খবর পাওয়ার পরপরই পাবনা সদর থানা পুলিশের একটি শক্তিশালী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ উভয় পক্ষকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পাবনা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনী মাঠে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। বর্তমানে বুদের হাট ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ টহল দিচ্ছে।
পাবনা-৫ আসনটি ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলেরই শক্তিশালী ভোট ব্যাংক রয়েছে। গত কয়েকটি নির্বাচনে এই দুই দল জোটে থাকলেও এবার আলাদাভাবে নির্বাচনে লড়ছে। ফলে মিত্র থেকে এখন তারা একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত কেবল একটি স্থানীয় গোলমাল নয়, বরং এটি বড় কোনো রাজনৈতিক ফাটলের ইঙ্গিত। শরিয়াহ আইন বা আদর্শিক প্রশ্নে দুই দলের সাম্প্রতিক দূরত্বের প্রভাব এখন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপরও পড়তে শুরু করেছে।
বুদের হাটের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, "আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে চাই। কিন্তু প্রচারণার শুরুতেই যদি দুই বড় দল এভাবে মারামারি করে, তবে ভোটের দিন আমরা কেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পাব না।" সাধারণ মানুষের মধ্যে এই চাপা আতঙ্ক নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
পাবনার বুদের হাটের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে জামায়াত নিজেদের শক্তি প্রমাণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিএনপি তাদের পুরনো রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে। নির্বাচন কমিশনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই দুই দলের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমন করা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাবনার এই সংঘাত যদি দেশের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ে, তবে নির্বাচনী পরিবেশ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
এএন