শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমের নৃশংস মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় চরম উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বুধবার ঝিনাইগাতী উপজেলা স্টেডিয়ামে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার উপস্থিতিতে একটি নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমানের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহার পাঠের আয়োজন করা হয়েছিল। সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন দলের সমর্থকেরা জড়ো হতে থাকেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল আলম রাসেল এবং প্রার্থীরা মঞ্চে ওঠার পরেই বিপত্তি বাধে। সামনের সারিতে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা এবং পরে তা ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়।
স্টেডিয়ামের বিশাল প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার সময় কয়েক শ চেয়ার ভাঙচুর করা হয় এবং বেশ কিছু মোটরসাইকেল অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। এই ঘটনায় দুই দলের অন্তত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে সন্ধ্যার দিকে ঝিনাইগাতী শহরে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষের সময়। শ্রীবরদী উপজেলার গজরিপা ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল মান্নান অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর আচমকা ধাওয়া দেয়। পালানোর সময় মাওলানা রেজাউল করিমকে তারা ধরে ফেলে। কোনো কিছু বোঝার আগেই তাকে মাটিতে ফেলে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে থেঁতলে দেওয়া হয়।
রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে শেরপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাথার ক্ষত গভীর হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। সেই যাত্রাপথেই মৃত্যু হয় এই নেতার।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে রেজাউল করিমের নিজ গ্রাম শ্রীবরদীর চাউলিয়ায় গিয়ে দেখা গেছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার এই আরবি প্রভাষক এবং স্থানীয় মসজিদের ইমামের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর পুরো গ্রাম যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। গ্রামবাসী তাদের প্রিয় ‘মাওলানা সাহেব’-এর জন্য কবরের মাটি খুঁড়ছেন, আর বাড়িতে চলছে স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদ।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, ‘রেজাউল করিম কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের এলাকার একজন আদর্শ শিক্ষক ও ইমাম। এমন অমায়িক একজন মানুষকে এভাবে মরতে হবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।
জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমান এই ঘটনাকে ‘নৃশংস ও কাপুরুষোচিত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনী মাঠ থেকে জামায়াতকে সরিয়ে দিতে এবং ভীতি প্রদর্শন করতে বিএনপি এই পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। তিনি অবিলম্বে ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে দ্রুতই হত্যা মামলা দায়ের করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
শেরপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক উপল হাসান জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে আসার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও আঘাতের তীব্রতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে। তবে প্রাথমিকভাবে মাথায় গুরুতর আঘাতকেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার সম্পর্ক যখন জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে, ঠিক তখনই শেরপুরের এই সংঘাত দুই দলের স্থানীয় কর্মীদের মধ্যকার চরম অবিশ্বাসের চিত্র তুলে ধরেছে। নির্বাচনী মাঠে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই ধরণের হানাহানি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বর্তমানে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে যাতে করে এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো সংঘাত তৈরি না হয়।
একজন মাদ্রাসা শিক্ষক এবং রাজনৈতিক নেতার এমন করুণ পরিণতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য এক অশনি সংকেত। ইটের আঘাতে একজন মানুষের মাথা থেঁতলে দেওয়ার মতো নৃশংসতা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনীতির পরিচয় হতে পারে না। চাউলিয়া গ্রামের নিস্তব্ধতা আর স্বজনদের আহাজারি এখন বিচার চাইছে। প্রশাসন যদি দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে নির্বাচনী উত্তাপ আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এএন