ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপের মধ্যেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে রাজনৈতিক সহিংসতা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এতে বিএনপি কার্যালয়সহ অন্তত ১২টি দোকান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার দিবাগত গভীর রাতে উপজেলার নাটঘর বাজার এলাকায় অবস্থিত বিএনপি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও বাজার ব্যবসায়ীরা জানান, রাত আনুমানিক দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে একদল মুখরোশধারী দুর্বৃত্ত হঠাৎ নাটঘর বাজারে হানা দেয়। তারা সরাসরি বিএনপি কার্যালয় লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা বা দাহ্য পদার্থ ছুড়ে মারলে মুহূর্তেই আগুন জ্বলে ওঠে। আগুনের শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পাশের চাল, কাপড় এবং স্টেশনারি দোকানগুলোও গ্রাস করে নেয়।
খবর পেয়ে নবীনগর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে এর আগেই বিএনপি কার্যালয় এবং ১২টি দোকানের মালপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাজারের নৈশপ্রহরীরা জানান, দুর্বৃত্তরা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে তাৎক্ষণিক শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সোমবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান। পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ দেখে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য তীব্র নিন্দা জানান।
অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান অভিযোগ করে বলেছেন, এই ঘটনার জন্য তিনি সরাসরি স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী নাজমুল হোসেন তাপসের অনুসারীদের দায়ী করছেন।
তাঁর দাবি, নির্বাচনী প্রচারণায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তিনি বলেন, নাজমুল হোসেন তাপসের সমর্থকরা আগেও তাঁর নেতা-কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিয়ে আসছিল।
তাঁর মতে, ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী নাজমুল হোসেন তাপসের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর নির্বাচনী ক্যাম্প জানিয়েছে, তিনি বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই নাটঘর বাজার এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা খবর পাওয়ার পরপরই রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। অগ্নিকাণ্ডের উৎস এবং এর পেছনে রাজনৈতিক কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে এই অগ্নিকাণ্ড নবীনগরের নির্বাচনী নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আগুনের এই ঘটনা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখন তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের নির্বাচনী লড়াই এখন কেবল ব্যালটে সীমাবদ্ধ নেই, তা আগুনের হলকায় রূপ নিয়েছে। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই সহিংসতা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এএন