দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম এখন কার্যত নিথর। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ বুধবার সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীরা। এর ফলে বন্দরের অভ্যন্তরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কমা কার্গো ডেলিভারি এবং জাহাজ চলাচলের মতো সমস্ত অপারেশনাল কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এর আগে গত শনিবার থেকে টানা তিন দিন প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টার সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। দাবি আদায় না হওয়ায় আজ থেকে তারা আন্দোলনের মাত্রা বাড়িয়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচিতে রূপান্তর করেছেন।
সকাল থেকেই বন্দরের এনসিটি কমা সিসিটি বা চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল এবং জেনারেল কার্গো বার্থের জেটিগুলোতে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। বহির্নোঙরে বর্তমানে প্রায় ৯৬টি জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে। জেটিতে থাকা ১১টি জাহাজও ক্রেন গুটিয়ে অলস বসে আছে। আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে কোনো নতুন জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারছে না কমা আবার পণ্য খালাস শেষ হওয়া জাহাজগুলো বন্দর ত্যাগ করতে পারছে না।
বন্দরের গেটগুলোতে কয়েক হাজার পণ্যবাহী ট্রাক ও লরি আটকা পড়ে আছে। পণ্য ডেলিভারি বন্ধ থাকায় ইয়ার্ডে কনটেইনারের পাহাড় জমেছে কমা যা দেশের পোশাক খাতসহ সামগ্রিক বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকনের নেতৃত্বে এই আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারীদের দাবি কমা ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়া হলে চট্টগ্রাম বন্দর লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ কমা ঢাকায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডা কার্যালয়ে দর কষাকষি কমিটির কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই আত্মঘাতী চুক্তিতে সই নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১৬ জন শ্রমিক কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে কমা যা আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে।
গত সোমবার সচিবালয়ে নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন কমা এনসিটি ইজারা দেওয়ার চুক্তি এখনও প্রক্রিয়াধীন। এই চুক্তি যদি দেশের অনুকূলে থাকে তবেই হবে কমা নতুবা হবে না। সরকার রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করছে না। এরপরও কাদের উসকানিতে এই আন্দোলন হচ্ছে কমা তা আমার জানা নেই।
উপদেষ্টা আরও হুঁশিয়ারি দেন যে কমা রমজানের আগে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের স্থবিরতা বিশ্লেষণে দেখা যায় কমা জেটি ও ইয়ার্ড জনশূন্য থাকায় অপারেশনাল কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বহির্নোঙরে ৯৬টি জাহাজ আটকা পড়ায় পাইলটেজ কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়েছে। গেট দিয়ে ট্রাক লরি চলাচল বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে পোশাক খাতের শিপমেন্ট ও রমজানের ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ায় ব্যবসায়ী মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সামনে পবিত্র রমজান মাস। বহির্নোঙরে ভাসতে থাকা জাহাজগুলোর বড় অংশেই চিনি কমা তেল ও ছোলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রয়েছে। এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বাজারে পণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। বিজিএমইএ এবং চেম্বার নেতৃবৃন্দ দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকার ইজারা প্রক্রিয়া থেকে সরে না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অনড় অবস্থানে রয়েছেন শ্রমিকরা। দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড সচল করতে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ সংলাপ এখন সময়ের দাবি।
জেএইচআর