অচল হওয়ার পথে চট্টগ্রাম বন্দর: কাল থেকে লাগাতার ধর্মঘট, বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধের ডাক

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর আবারও গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। মাত্র দুই দিনের বিরতির পর আগামীকাল রোববার সকাল আটটা থেকে বন্দরজুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।

এবারের ধর্মঘট কেবল জেটি বা টার্মিনালে সীমাবদ্ধ থাকছে না, প্রথমবারের মতো বন্দরের বহির্নোঙরেও সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের আমদানিকৃত পণ্য ও শিল্প কাঁচামাল খালাস কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়করা এই কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেন। 

আন্দোলনের মূল কারণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি প্রক্রিয়া। আন্দোলনকারীরা এই ইজারা প্রক্রিয়াকে বন্দরের সার্বভৌমত্ব ও স্থানীয় স্বার্থবিরোধী বলে দাবি করে আসছেন।

গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার সাথে বৈঠকের পর ব্যবসায়ীদের স্বার্থ এবং পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে নিত্যপণ্য খালাসের সুবিধার্থে আন্দোলন দুই দিন স্থগিত করা হয়েছিল। তবে স্থগিতাদেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি পাল্টা পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। 

সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন অভিযোগ করেন, যখন তাঁরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজছিলেন, ঠিক তখনই বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৫ জন আন্দোলনকারীর সম্পদ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে বা দুদক চিঠি পাঠিয়েছে।

শুধু তাই নয়, আন্দোলনকারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির জন্যও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে ইব্রাহিম খোকন বলেন, আমরা দেশের কথা ভেবে ধর্মঘট স্থগিত করেছিলাম, কিন্তু বন্দর চেয়ারম্যান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ চালিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের হয়রানি করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার দায় বন্দর চেয়ারম্যানকেই নিতে হবে। এই অসম্মানজনক আচরণের প্রতিবাদেই আমরা পূর্ণ অচল অবস্থার ডাক দিতে বাধ্য হয়েছি।

সংগ্রাম পরিষদ বর্তমান সংকট নিরসনে চারটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছে। তাদের প্রথম দাবি হলো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে লিজ বা ইজারা দেওয়া যাবে না মর্মে সরকারের স্পষ্ট ঘোষণা। দ্বিতীয় দাবি হিসেবে তারা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রত্যাহার এবং তাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া সব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং ভবিষ্যতে কোনো হয়রানি না করার নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সমুদ্রপথে আমদানি ও রপ্তানির প্রায় ৭৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ করে কনটেইনার বা পণ্যবাহী বাক্স পরিবহনের ক্ষেত্রে এই বন্দরের ওপর দেশ ৯৯ শতাংশ নির্ভরশীল। লাগাতার ধর্মঘট শুরু হলে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি পণ্য এবং কলকারখানার কাঁচামাল আনা নেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। এতে কাঁচামালের অভাবে কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারে। এ ছাড়া রমজান সামনে রেখে চিনি, ডাল ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপণ্য খালাস বন্ধ হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।

আগের আন্দোলনগুলোতে মূলত টার্মিনালের ভেতরে পণ্য ওঠানামা বন্ধ ছিল। কিন্তু এবারের ঘোষণা অনুযায়ী, কাল থেকে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসকারী লাইটার জাহাজ বা ছোট জাহাজগুলোও বন্ধ রাখা হবে। এতে পুরো সমুদ্রসীমার পরিবহন ব্যবস্থা স্তব্ধ হয়ে পড়বে, যা বন্দরের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হতে যাচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুদকের চিঠি দেওয়া একটি দাপ্তরিক প্রক্রিয়া এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতির অংশ।

তবে আন্দোলনকারীরা একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি হিসেবে দেখছেন। আজকের সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ হারুন, তসলিম হোসেন এবং আবুল কাসেমসহ পরিষদের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কাল সকাল থেকে বন্দরে কোনো চাকা ঘুরবে না। একদিকে বিদেশি বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের দোহাই দিয়ে ইজারা প্রক্রিয়া, অন্যদিকে স্থানীয় শ্রমিকদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের চাপে দেশের অর্থনীতি এখন বড় ঝুঁকির মুখে।

জেএইচআর