আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজধানীর উপকণ্ঠের শিল্পনগরী সাভার ও আশুলিয়া এখন তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়েছে। শ্রমিক অধ্যুষিত ঢাকা-১৯ আসনে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক, পথসভা আর গণসংযোগে মুখর এলাকা। সবারই লক্ষ্য শ্রমিকের মন জয় করা।
৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন ভোটার নিয়ে গঠিত এ আসনে পুরুষ ভোটার ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৬, নারী ৩ লাখ ৬৭ হাজার ১৫১ এবং হিজড়া ভোটার ১৩ জন। সংখ্যার চেয়েও এ আসনের মূল প্রভাবক বা নিয়ন্ত্রক শক্তি হলো শ্রমিক সমাজ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় দুই হাজার শিল্প-কারখানায় কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকই এখানে জয়-পরাজয়ের ভাগ্য নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন।
ঢাকা-১৯ মানেই মূলত শ্রমিক রাজনীতি। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ওয়ার্কশপ ও ঝুট ব্যবসাসহ দেশের অন্যতম বড় শিল্পঘন এলাকা এটি। ফলে প্রার্থীদের প্রচারণার কেন্দ্রে থাকছে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া।
সাভার, জামগড়া, আশুলিয়া, কাঠগড়া, রেডিও কলোনি ও উলাইলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এমন প্রতিনিধি চান যিনি চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূল করবেন। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ও যানজটের স্থায়ী সমাধান এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবেন।
শ্রমিক নেতা খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, এ আসনে ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, কারখানায় হামলা, মাদক ও চাঁদাবাজি দীর্ঘদিনের সমস্যা। দুই দশকে স্পেকট্রাম ধস, তাজরীন অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনায় হাজার হাজার শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। তবু প্রশ্ন রয়ে গেছে নিরাপদ শিল্পাঞ্চল কবে হবে? এ প্রশ্নই এখন ভোটের মাঠের বড় ইস্যু।
নির্বাচন ঘিরে ৪৩টি শ্রমিক সংগঠন প্রার্থীদের সামনে একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিক কলোনি নির্মাণ, সরকারি স্কুল ও আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, রেশনিং ব্যবস্থা চালু এবং বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করা। শ্রমিক নেতাদের সাফ কথা, এসব দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
জিকে ফ্যাশনের নারী শ্রমিক রতনা আক্তার বলেন, বর্তমান মজুরি দিয়ে পরিবার চালানোই কঠিন। বাড়িভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের চাপে সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। অটোরিকশাচালক মহিদুল ইসলামের ক্ষোভ রাস্তাঘাট নিয়ে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতায় নোংরা পানির মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের হেঁটে যেতে হয়। যিনি এগুলো ঠিক করবেন, তাকেই ভোট দেবেন তারা।
এ আসনে লড়ছেন বিএনপির ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, ১১ দলীয় জোট সমর্থিত এনসিপির দিলশানা পারুল, ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ ফারুক খান, এলডিপির চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, এনপিপির মো. ইসরাফিল হোসেন সাভারী, জাতীয় পার্টির মো. বাহাদুর ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের শেখ শওকত হোসেন ও মুসলিম লীগের মো. কামরুল।
বিএনপি প্রার্থী ডা. সালাউদ্দিনের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার ইতিহাসই তার জনপ্রিয়তার ভিত্তি। অন্যদিকে এনসিপির দিলশানা পারুল এ আসনের প্রথম নারী সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন।
শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, বাস্তবতার কঠিন মাটিতে কে দাঁড়াতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ইএইচ