চট্টগ্রাম বন্দরে দ্বিমুখী বাস্তবতা: চেয়ারম্যানের দাবি ‘সচল’, মাঠের চিত্র ‘অচল’

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি  প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম

চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসন এবং আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে এক স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। একদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি সবকিছু ‘স্বাভাবিক’ এবং ‘সচল’, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের হৃদস্পন্দন প্রায় স্তব্ধ। 

রোববার দুপুর থেকে এই পাল্টাপাল্টি দাবি ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বে এক ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ চত্বর আজ রণক্ষেত্রে পরিণত না হলেও এক ভারী নীরবতা গ্রাস করেছে পুরো এলাকাকে। নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ধর্মঘট আজ এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বেলা সোয়া ১২টার দিকে বন্দর ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান দাবি করেছেন যে, বন্দরের সকল কার্যক্রম সচল রয়েছে। তবে সরেজমিনে এবং শ্রমিক সূত্রের তথ্যে পাওয়া যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।

সংবাদ সম্মেলনে বন্দর চেয়ারম্যান দাবি করেন, সাধারণ কর্মচারীরা কাজে ফিরেছেন এবং কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই গাড়ি চলাচল করছে। তিনি আন্দোলনকারীদের ‘বিপথগামী’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, বন্দরের কাজ সচল আছে। আমি নিজে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে কথা বলেছি, তারা কর্মক্ষেত্রে চলে গেছেন। কিছু লোক হুমকি দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। যারা রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি অচল করতে চায়, তারা মূলত জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

চেয়ারম্যান আরও স্পষ্ট করেন যে, এনসিটি ইজারা নিয়ে দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে এখনো চূড়ান্ত কোনো চুক্তি বা দরকষাকষি শেষ হয়নি। সুতরাং আন্দোলনের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে তিনি মনে করেন।

চেয়ারম্যানের দাবির ঠিক বিপরীতে বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা। সংবাদ সম্মেলন পরবর্তী সময়ে বন্দরের ৪ নম্বর গেট থেকে এনসিটি টার্মিনাল পর্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গেটগুলো দিয়ে কোনো পণ্যবাহী ট্রাক বা ট্রেইলার যাতায়াত করছে না। জাহাজ থেকে কন্টেইনার নামানো বা ওঠানোর কোনো দৃশ্য চোখে পড়েনি। ক্রেনগুলো অলস দাঁড়িয়ে আছে। 

শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা জানিয়েছেন, বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তর সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ দেখাতে এনসিটি টার্মিনালে একটি জাহাজ থেকে নামমাত্র কয়েকটি কন্টেইনার নামিয়ে ছবি তুলে রাখার কৃত্রিম উদ্যোগ নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ, যা সাধারণ কর্মচারীদের বিরোধিতায় ভেস্তে যায়।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন আলোচনার পরিবর্তে দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সংগ্রাম পরিষদের দুই প্রবীণ নেতাকে তুলে নেওয়া হয়েছে।

বন্দর এলাকায় বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের দাবি নাকচ করে তিনি বলেন, কোনো সাধারণ কর্মচারী ভয়ে বা চাপে কাজে যোগ দেয়নি।

শ্রমিক-কর্মচারীদের অনড় অবস্থানের পেছনে রয়েছে চারটি সুনির্দিষ্ট দাবি এনসিটি কোনোভাবেই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়া যাবে না, সংকট ঘনীভূত করার দায়ে বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যানের প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সম্পদ তদন্তের চিঠি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল ও আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা।

দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা কেবল একটি শ্রমিক আন্দোলন নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বড় এক চ্যালেঞ্জ। কর্তৃপক্ষের ‘সব ঠিক আছে’ বলার প্রবণতা এবং শ্রমিকদের ‘সব বন্ধ’ করে দেওয়ার লড়াইয়ের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা। রমজানের আগে এই সংকট নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই দ্বিমুখী বাস্তবতার বলি হবে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি।

এএন