যমুনা সেতুতে ২৪ ঘণ্টায় তিন কোটি টাকার রেকর্ড টোল আদায়

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৬:০১ পিএম

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা এখন ফাঁকা হতে শুরু করেছে, আর এর বিপরীতে কর্মব্যস্ততা বেড়েছে উত্তরবঙ্গের লাইফলাইন খ্যাত বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুতে। নাড়ির টানে ভোট দিতে যাওয়া মানুষের চাপে যমুনা সেতুতে গত ২৪ ঘণ্টায় যানবাহনের সংখ্যা এবং টোল আদায়ের পরিমাণ অতীতের যেকোনো সাধারণ সময়ের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

ভোটের আমেজ এখন কেবল রাজপথের প্রচারণায় সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের মহাসড়কগুলোতেও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে রাজধানীর কর্মজীবী মানুষেরা দলে দলে গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটছেন। এই ঘরমুখী মানুষের স্রোতে গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা সেতুতে যানবাহনের চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত সেতুটি দিয়ে যাতায়াত করেছে প্রায় ৩৭ হাজার যানবাহন, যা থেকে আদায় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকার টোল।

যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় মোট ৩৬ হাজার ৯২৩টি যানবাহন সেতুটি পার হয়েছে। সাধারণ সময়ে এই সেতু দিয়ে দিনে গড়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার যানবাহন যাতায়াত করে। কিন্তু নির্বাচনের কারণে হঠাৎ এই সংখ্যায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ থেকে একদিনে সর্বমোট ২ কোটি ৯৪ লাখ ৭১ হাজার ৬৬০ টাকা টোল আদায় করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে কতটা আগ্রহ ও উদ্দীপনা কাজ করছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা ছেড়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাওয়ার প্রবণতা ছিল সবচেয়ে বেশি। রাজধানী থেকে উত্তরবঙ্গগামী যানের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৯৮৯টি। এখান থেকে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার ৯০০ টাকা।

উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার দিকে আসা যানের সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ৩৪টি, যেখান থেকে টোল সংগৃহীত হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ, উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার মানুষ এখন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে উন্মুখ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, যার প্রতিফলন ঘটেছে যমুনা সেতুর ট্রাফিক ডাটায়।

যমুনা সেতুর ইতিহাসে এই ধরনের যানবাহনের চাপ সাধারণত কেবল দুই ঈদেই দেখা যায়। গত বছরের (২০২৫) জুন মাসে পবিত্র ঈদুল আজহার ৫ দিনে গড়ে ৪৪ হাজারেরও বেশি গাড়ি পার হয়েছিল। তবে নির্বাচনের আগের এই একদিনের পরিসংখ্যান প্রায় ঈদের পিক-সময়ের (Peak Time) কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। গত ঈদে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টায় ৪৮ হাজার ১৮৪টি গাড়ি পার হয়েছিল, আর বর্তমান নির্বাচনের একদিন আগেই তা ৩৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এটি নির্দেশ করছে যে, এবারের নির্বাচন মানুষের কাছে একটি বড় জাতীয় উৎসবের মর্যাদা পেয়েছে।

হঠাৎ গাড়ির সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় যমুনা সেতুর দুই প্রান্তের টোল প্লাজাগুলোতে বাড়তি বুথ চালু করা হয়েছে। সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাতে ভোটারদের রাস্তায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়, সেজন্য স্বয়ংক্রিয় টোল সংগ্রহের পাশাপাশি ম্যানুয়াল বুথগুলোও সক্রিয় রাখা হয়েছে। টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ মহাসড়কে নিরাপত্তা ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ টহল ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এখন পর্যন্ত বড় কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া না গেলেও যানবাহনের ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।

বাসে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি ফেরা মানুষদের চোখেমুখে ছিল উত্তেজনার ছাপ। দীর্ঘ সময় জ্যামে থাকলেও তারা আনন্দিত যে, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে তারা ভোট দিতে পারছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অতিরিক্ত চাপের কারণে মহাসড়কে নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার যাতে নির্বাচনী যাত্রা ট্র্যাজেডিতে পরিণত না হয়।

যমুনা সেতুর এই রেকর্ড টোল আদায় কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার একটি প্রতিচ্ছবি। রাজধানী ঢাকা যখন জনশূন্য হচ্ছে, তখন যমুনা সেতু দিয়ে পার হওয়া হাজার হাজার মানুষ আসলে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন একটি নতুন আগামীর স্বপ্ন। প্রশাসনের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এই জনস্রোত নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবে এটাই এখন কাম্য।

এএন