শরীয়তপুর জেলা, যা গত কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক মহলে ‘আওয়ামী লীগের অভেদ্য দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত ছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেখানে বইছে ভিন্ন হাওয়া। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জেলার তিনটি আসনেই নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
তবে এই জয়ের পেছনে কেবল দলীয় জনসমর্থনই নয়, বরং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশের সমর্থন ও সরাসরি ভোট একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর থেকে শরীয়তপুরের সংসদীয় আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। মাঝখানে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি একটি আসন পেলেও, মূলধারার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগই ছিল জেলার একচ্ছত্র অধিপতি। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবারের নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারেনি। এই শূন্যতায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এক নতুন কৌশলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংককে নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই শরীয়তপুরের ৬টি উপজেলায় আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিএনপিতে যোগদানের হিড়িক পড়ে। গত দুই মাসে অন্তত ৫ হাজারেরও বেশি আওয়ামী লীগ কর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে নাম লিখিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবং দলীয় কোনো প্রার্থী না থাকায় তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোকে ঠেকাতে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীককেই বেছে নিয়েছেন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা সপরিবারে কেন্দ্রে গিয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।
এই আসনে মোট ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে বিজয়ী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আহমেদ।
বিজয়ের পর সাঈদ আহমেদ বলেন, "এটি সকল মত ও পথের মানুষের বিজয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর শরীয়তপুর-১ আসনের মানুষ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিতে পেরেছে।"
এই আসনে বিএনপির জেলা সভাপতি সফিকুর রহমান বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
সফিকুর রহমানের মতে, আওয়ামী লীগের অনেক সাধারণ ভোটার এবং নেতা এবার ষড়যন্ত্রমুক্ত পরিবেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে ভোট দিয়েছেন।
এ আসনে জামায়াতের সাথে বিএনপির তীব্র লড়াই হলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নিরব সমর্থনের পাল্লা বিএনপির দিকেই ভারী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শরীয়তপুরের এই ফলাফল বাংলাদেশের রাজনীতির এক অদ্ভুত বাস্তবতা তুলে ধরেছে। যে জেলায় আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কিছু কল্পনা করা কঠিন ছিল, সেখানে দলটির নেতা-কর্মীদের বিএনপিতে যোগদান বা সমর্থন দেওয়া কেবল কৌশলগত নাকি আদর্শিক পরিবর্তন তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত ‘ধানের শীষের’ এই বিজয় শরীয়তপুরের রাজনৈতিক মানচিত্রকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
স্বেচ্ছায় হোক বা কৌশলগত কারণে, শরীয়তপুরের ‘আওয়ামী ভোট’ যে বিএনপির ঘরে উঠেছে, তা ভোটের ব্যবধান এবং দলত্যাগের পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। জেলা বিএনপি এখন এই জয়কে সংহত করে এলাকায় দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য ঘোচানোর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
এএন