নদীর পাড়ে একটু স্বস্তির খোঁজে যাওয়া যে জীবনের শেষ যাত্রা হবে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি আনন্দ মোহন কলেজের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র নুরুল্লাহ শাওন। ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের চোখে এখন শোকের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ আর নিরাপত্তাহীনতা। গত বুধবার বিকেলে নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ সময় পর শুক্রবার রাতে যখন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে শাওনের নিথর দেহ উদ্ধার হলো, তখন কেবল একটি পরিবার তাদের সন্তান হারায়নি, বরং ময়মনসিংহের নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি আবারও উম্মোচিত হয়েছে।
এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নগরের ক্রমবর্ধমান ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার। ছিনতাই, মারধর আর এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের নেশায় বুঁদ হওয়া একদল কিশোরের ধাওয়ায় প্রাণ হারাতে হয়েছে শাওনকে। এই নৃশংসতার প্রতিবাদে আজ শনিবার উত্তাল হয়ে ওঠে ময়মনসিংহ নগরী।
গত বুধবার বিকেলে জয়নুল আবেদিন উদ্যান সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান রিয়াদকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন শাওন। নদীর শান্ত পরিবেশে সময় কাটিয়ে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে যখন তারা ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায় সাতজনের একটি কিশোর দল। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী রিয়াদের বর্ণনা অনুযায়ী, কিশোররা ঘিরে ধরেই তাদের কাছে থাকা টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী দাবি করে।
শাওন ও রিয়াদ জানান যে, তাদের কাছে নৌকাভাড়ার সামান্য টাকা ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু এই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারেনি কিশোর অপরাধীরা। তারা চড়-থাপ্পড় ও মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে শাওন প্রতিবাদ করলে কিশোররা আরও হিংস্র হয়ে ওঠে এবং তাকে লক্ষ্য করে বেদম প্রহার শুরু করে। প্রাণভয়ে দুই বন্ধু দুই দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। তিন কিশোর ধাওয়া করে রিয়াদকে এবং চারজন পিছু নেয় শাওনের। রিয়াদ কোনোমতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে ওপাড়ে ফিরতে পারলেও, শাওন অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যান। ২৬ ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর উদ্ধার হয় তার লাশ।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযুক্ত সাত কিশোরের সবার বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। তারা নগরের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিদ্যালয়ের সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। নগরীর চর জেলখানা বিন পাড়া এলাকার বাসিন্দা এই কিশোররা মূলত ‘বিন’ সম্প্রদায়ের।
পুলিশ জানিয়েছে, এই কিশোররা প্রযুক্তিতে ততটা দক্ষ নয় এবং তারা মোবাইল ফোনও ব্যবহার করে না। এদের পরিবারগুলো চরম দারিদ্র্যের শিকার। দারিদ্র্য আর সঠিক নির্দেশনার অভাবে এরা শৈশব থেকেই অপরাধ জগতের অন্ধগলিতে পা বাড়াচ্ছে। ইতিমধ্যেই ১৫ বছর বয়সী একজনকে গ্রেপ্তার করে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে বাকিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সহপাঠীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে আনন্দ মোহন কলেজ ক্যাম্পাস। শুক্রবার রাতে লাশ উদ্ধারের পর থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নগরের টাউন হল মোড় অবরোধ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। আজ শনিবার দুপুরেও তারা পুলিশ সুপার কার্যালয় ঘেরাও করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
আনন্দ মোহন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক তানজিল আহমেদ বলেন, ‘শাওনের মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। শহরজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের যে অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে, তার বলি হতে হলো আমাদের ভাইকে। অবিলম্বে ময়মনসিংহকে ছিনতাই ও মাদকমুক্ত করতে হবে, অন্যথায় শিক্ষার্থীরা কঠোর আন্দোলনে যাবে।’
ময়মনসিংহে কিশোর অপরাধের গ্রাফ যে ঊর্ধ্বমুখী, তার প্রমাণ মেলে গত ৩ জানুয়ারির এক ঘটনায়। জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র মিফতাহুল জান্নাত নিলয়কে তার সহপাঠীরাই দিনের আলোতে স্কুলের ভেতরে সাতবার ছুরিকাঘাত করে। অপরাধ ছিল একটাই— নিলয় তাদের কিশোর গ্যাংয়ে যোগ দিতে রাজি হয়নি। মাদকাসক্ত ওই কিশোররা নিলয়কে স্কুল বন্ধের দিনে ডেকে নিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়।
স্থানীয়দের মতে, নগরের অলিগলিতে এখন কিশোরদের জটলা দেখা যায়। এরা রাজনৈতিক বড় ভাইদের আশ্রয়ে অথবা মাদক কারবারিদের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যার পর জয়নুল আবেদিন উদ্যান বা ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চল সাধারণ মানুষের জন্য এখন মূর্তিমান আতঙ্ক।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, ময়মনসিংহের পুলিশ এই কিশোর গ্যাং কালচার নিয়ে কাজ করছে। তবে অভিযুক্তরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ বা রিমান্ডে নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
শাওনের মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট নিয়ে তিনি বলেন, ‘শরীরে সরাসরি কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে কিশোরদের ধাওয়ায় এবং তাদের প্ররোচনায় সে নদীতে পড়ে ডুবে মারা গেছে বলে আমাদের প্রাথমিক ধারণা। অপরাধীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই কিশোররা দলবদ্ধভাবে চলে এবং একজনকে নেতা হিসেবে মানে। তাদের ‘সফটলি হ্যান্ডল’ বা কোমলভাবে মোকাবিলা করার যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটি অনেক সময় তদন্তের গতিকে ধীর করে দেয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহের সম্পাদক আলী ইউসুফ এই পরিস্থিতির জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘদিনের অবজ্ঞাকে দায়ী করেছেন।
তিনি বলেন, কিশোররা যখন অপরাধী হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে সমাজ ও পরিবার ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু অপরাধ সংঘটনের পর যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে কিশোর গ্যাং কালচার আরও ডালপালা মেলবে। প্রশাসনকে শুধু আশ্বাস দিলে হবে না, দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।‘
শাওনের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। রসায়ন নিয়ে পড়ে বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু একদল কিশোরের লালসার কাছে সেই স্বপ্ন এখন ব্রহ্মপুত্রের বালুচরে মিশে গেছে। ময়মনসিংহের এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র আর আইনি জটিলতার আড়ালে অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে আরও কত শাওনকে এভাবে অকালে বিদায় নিতে হবে।
এএন