খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় এক বাকপ্রতিবন্ধী মার্মা তরুণী নিখোঁজের সাত দিন পর রহস্যজনকভাবে উদ্ধার হওয়ায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয়রা একজনকে আটক করলেও এখনো পর্যন্ত থানায় এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি। ফলে ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩ মার্চ সকালে গুইমারা উপজেলার ২ নং হাফছড়ি ইউনিয়নের হাফছড়ি পাড়ার ২১ বছর বয়সী বাকপ্রতিবন্ধী মার্মা তরুণী জালিয়াপাড়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করলেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
নিখোঁজের সাত দিন পর সোমবার (৯ মার্চ) সকালে জালিয়াপাড়া এলাকায় তাকে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে এলাকাবাসী ও পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসা ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
মঙ্গলবার সরেজমিনে ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে আছেন। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় ঘটনার বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
ঘটনার পর স্থানীয়রা ভুক্তভোগীর কাছে থাকা মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে গড়াইছড়ি এলাকা থেকে অংক্যজাই মার্মা (৩৭) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে। তিনি মহালছড়ি উপজেলার তিন্দুকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয়দের দাবি, আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ক্যজই মার্মা (৫০) ইতোমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে গেছে।
এ ঘটনায় নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আটক ব্যক্তিকে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যানের হেফাজতে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘটনাটি সামাজিক সমঝোতার মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনি পথে না যেতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীর বাবা উথোয়াইমং মার্মা বলেন, “আমার মেয়ে একজন বাকপ্রতিবন্ধী। সে নিজের কষ্টটুকুও ঠিকভাবে বলতে পারে না। তাকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়েছে। আমি এর সঠিক বিচার চাই।”
উত্তর হাফছড়ি পাড়া ধর্মরক্ষিত বৌদ্ধ বিহারের নেনাচরা ভান্তে বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
গুইমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেহরাওয়ার্দী বলেন, “নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত ধর্ষণের বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, একজন বাকপ্রতিবন্ধী ও অসহায় তরুণীর সঙ্গে এমন ঘটনার অভিযোগ ওঠার পরও যদি বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়, তবে তা আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়—এটি পাহাড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠারও পরীক্ষা।
এএন